চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) আলোচিত প্রকৌশলী দম্পতি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মাদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী এবং তার স্ত্রী নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারজানা মুক্তাকে চট্টগ্রামের বাইরে বদলি করেছে সরকার।
তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত চলমান থাকতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের এক মাস পর শুরু হওয়া তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) স্থানীয় সরকার বিভাগ পৃথক প্রজ্ঞাপনে শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এবং ফারজানা মুক্তাকে রংপুর সিটি করপোরেশনে বদলি করে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-২ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এ বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. রবিউল ইসলাম।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মাদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারজানা মুক্তাকে রংপুর সিটি করপোরেশনের শূন্যপদে বা সমপদে পদায়ন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজ নিজ বেতনক্রম অনুযায়ী নতুন কর্মস্থল থেকে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন। তাদের জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি, অবসরসহ প্রশাসনিক বিষয়ও নতুন কর্মস্থল থেকেই নিষ্পন্ন হবে। আগামী ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে। অন্যথায় ২৭ জুলাই থেকে তাদের ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই প্রকৌশলীকে ঘিরে আলোচনা নতুন নয়। গত ২৫ জুন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে চট্টগ্রামবাসীর পক্ষে মেহেদী চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ তুলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাইরে বদলির দাবি জানানো হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ও ফারজানা মুক্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেয়। তদন্ত কমিটিকে অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
দাফতরিক নথি অনুযায়ী, মোহাম্মাদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে ঘিরে প্রশাসনিক আলোচনা দীর্ঘদিনের। ২০১৭ সালে একটি অভিযোগের ঘটনায় তিনি সাময়িকভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি পান। পরে উচ্চ আদালতের আদেশে চাকরিতে পুনর্বহাল হন।
এরপর ৯ জানুয়ারি ২০২০ সালের এক অফিস আদেশে তিনি সহকারী প্রকৌশলী থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বও পালন করেন।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রশাসনিক কারণে তাকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে বরিশাল সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়েছিল। একই সময়ে চসিকের সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হাশেমকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়।
তবে ওই সময় চসিকে প্রকৌশলী সংকটের কথা উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার বিভাগে চিঠি দেয় তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়। চিঠিতে বলা হয়, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ শূন্য থাকায় প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। পরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী আবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ফিরে আসেন।
চলতি বছরের ২৫ জুন চসিকের সংস্থাপন শাখার এক স্মারক থেকে জানা যায়, মোহাম্মাদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত এক বছরের জন্য মালয়েশিয়ায় উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন।
চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন আবেদনটি সুপারিশসহ স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে পাঠান। অভিযোগ ওঠার পর তার বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদন নিয়েও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা শুরু হয়।
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মাদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।