কৃষকের ছেলে ২ বছরে কীভাবে হলেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী?

ডেভিড ইমনের সিনেম্যাটিক গল্পের শুরু চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির  কাঞ্চননগরে। ডেভিড ইমন নামে আসলে সেখানে কারও অস্তিত্ব নেই। গ্রামে তার নাম ছিলো মোবারক হোসেন। অত্যন্ত সাধারণ এক পরিবার তার। বাবা মোহাম্মদ মূসা ছিলেন একজন কৃষক। দরিদ্র বাবার ঘরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা মোবারক অথবা ইমনের। লেখাপড়া বেশিদূর করেননি। কৈশোরের জড়িয়ে পড়েছিলেন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে! 

ছোটবেলায় ক্রিকেট পাগল ইমনের স্বপ্ন ছিল বড় ক্রিকেটার হয়ে গ্রামের নাম উজ্জ্বল করার। সাইকেলে চেপে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে নিয়মিত অনুশীলনে যাওয়া কিংবা কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নেটে লেগ স্পিন বল করা ইমনকে ঘিরে আশার আলো দেখেছিলেন স্থানীয়রাও। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, ভালো ক্রিকেটার হয়ে কাঞ্চননগরের নাম উজ্জ্বল করার বদলে, কেবল দ্রুত ‘বড়লোক’ হওয়ার অন্ধ লোভে মাত্র ২৫ বছর বয়সে পুরো চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের আতঙ্কে পরিণত হয়েছেন সেই ইমন— যাকে সবাই চেনে ‘ডেভিড ইমন’ নামে।

গ্রাম ছেড়ে চট্টগ্রাম শহরে আসেন ইমন। সেখানে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের গ্রুপে যোগ দিয়ে চট্টগ্রামে অনেকগুলো হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এমনকি ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন ও একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর খুনে সরাসরি জড়িত ছিল ইমন। বিদেশি পিস্তল হাতে তার একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আরও আশ্চর্য ব্যাপার হলো সেসব ছবির বেশিরভাগই ভয়ভীতি দেখানোর উদ্দেশ্যে করা ফটোশ্যুটিং!  

তবে বাস্তবেও পরে তিনি সাজ্জাদ গ্রুপের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা হয়ে ওঠেন! জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী ভেডিড ইমন নামে কাউকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষ চিনতো না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সদস্য হিসেবে অপরাধ জগতে পরিচিতি পায় ইমন। তথ্যমতে, নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলায় এই চক্রের প্রভাব বেশি। এসব এলাকায় তারা নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে।

তার গুরু বড় সাজ্জাদের সঙ্গে সে বিদেশে দেখা করতেও গেছে অনেকবার। সর্বশেষ কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম শহরের এক ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে ভাঙ্গচুর ও হুমকির পর বেশ আলোচনায় আসলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হয়। তবে সে দেশে ছিল না বলে জানা যায়।  

জানা গেছে, ইন্টারনেট সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে গত এক মাসে দেড় কোটি চাঁদা আদায় করেছে ডেভিড ইমন বাহিনী। বিশেষ করে অক্সিজেন, মুরাদপুর, জিইসির মোড়, বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা ও পাঁচলাইশ এলাকা থেকে প্রতিটি কোম্পানির মালিককে ফোন করে হুমকি দিয়ে এই চাঁদা আদায় করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে কোনও ধরনের প্রতিবাদ ছাড়াই সন্ত্রাসীদের হাতে চাঁদা দিয়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। সর্বশেষ আজ যশোর হয়ে ভারত পালানোর সময় পুলিশের গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশিতে ধরা পড়ে ইমন! 

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ওমানে যান ইমন। বছরখানেক পর দেশে ফিরে আসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান তিনি। তখন নগরের বায়েজীদ বোস্তামী এলাকার আতুরার ডিপো এলাকায় অবস্থান শুরু করেন। সেখানেই শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।