তাদের সেবা করতে করতে মায়ের মৃত্যু, জানে না হাসপাতালে থাকা দুই শিশু

বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামে আক্রান্ত দুই সন্তানের অবিরাম সেবা করতে করতে নিজেই অসুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে মা লেংরুং ম্রোর (২৬) মৃত্যু হয়েছে। গত ২৯ জুলাই বাড়ি পৌঁছানোর পর মৃত্যু হয়। পরদিন পারিবারিকভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। তবে এখনও মায়ের মৃত্যুর কথা জানে না হাসপাতালে ভর্তি দুই সন্তান।

সদর হাসপাতালের হাম আক্রান্তদের জন্য স্থাপিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে দুই শিশু। হামে আক্রান্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়া তাদের চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তারা এখনও বুঝতে পারেনি, যে মাকে খুঁজছে তিনি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।

বিছানার পাশে বিমর্ষ মুখে বসে ছিলেন তাদের ১৯ বছর বয়সী চাচা ক্রংতং ম্রো। কখনও ভাইজির দিকে, কখনও ভাতিজার দিকে তাকিয়ে অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি।

ক্রংতং ম্রো বলেন, ‌‘আমাদের বাড়ি রুমা উপজেলার দুর্গম গ্যালেঙ্গা ইউনিয়নের চিনিপাড়া গ্রামে। গত ২৬ জুলাই আমার ভাবি লেংরুং ম্রো সুস্থ অবস্থায় হামে আক্রান্ত দুই সন্তানকে নিয়ে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। সন্তানদের সেবা করতে করতেই ২৮ জুলাই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। চিকিৎসকরা লেংরুং ম্রোর অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু সেখানেই অসহায় পরিবারের সামনে দাঁড়ায় কঠিন বাস্তবতা।’

ক্রংতং বলেন, ‘আমার বড় ভাই ক্রংসং ম্রো (২৮) নিরক্ষর। বাংলা ভাষাও ভালোভাবে বলতে পারেন না। একদিকে দুই সন্তান হাসপাতালে ভর্তি, অন্যদিকে হাতে কোনও টাকা ছিল না। শুনেছি চট্টগ্রাম মেডিক্যালে চিকিৎসায় অনেক খরচ হবে। সেই ভয় আর দারিদ্র্যের কারণে স্ত্রীকে সেখানে না নিয়ে গ্রামের বাড়িতে কবিরাজি চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। আর দুই শিশুর দেখাশোনার দায়িত্ব আমার ওপর দিয়ে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লেংরুং ম্রোকে আর বাঁচানো যায়নি।’

চার বছরের ডং ওয়াই ম্রো আর দুই বছরের কাইং ওয়াই ম্রো এখনও বারবার মাকে খুঁজছে। বান্দরবান সদর হাসপাতালের একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে হামের সঙ্গে লড়ছে দুই ভাই-বোন। তারা জানে না, মাত্র কয়েক দিন আগেও যিনি তাদের মাথার পাশে বসে সেবা করছিলেন, সেই মা লেংরুং ম্রো আর এই পৃথিবীতে নেই। সন্তানদের চিকিৎসা করাতে এসে নিজেই অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কাছে হার মানেন তিনি।

হামে আক্রান্ত দুর্বল দুই শিশুর শরীরজুড়ে এখনও জ্বরের ক্লান্তি। কখনও তারা কাকার হাত চেপে ধরে, কখনও চারপাশে তাকিয়ে যেন কাউকে খোঁজে।

এদিকে স্ত্রীর মৃত্যুর পর শিশু দুটির বাবা ক্রংসং ম্রোও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে শয্যাশায়ী। ফলে এতিমপ্রায় দুই শিশুর চিকিৎসা, দেখাশোনা এবং হাসপাতালের দিন-রাতের দায়িত্ব এখন কেবল কাকা ক্রংতং ম্রোর কাঁধে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে দংওয়াই ও কাইনওয়াই মাঝেমধ্যে কাকার দিকে তাকায়, আবার ওয়ার্ডের দরজার দিকেও চোখ ফেরায়। হয়তো তারা এখনও অপেক্ষা করছে, মা এসে আগের মতো কোলে তুলে নেবেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ নেই।

রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া এবং টিকাদানের ঘাটতির কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে ম্রোসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা।

বান্দরবান সদর হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত ২৪ জন চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে ১৫ জন শিশু, ছয় জন নারী ও তিন জন পুরুষ।

এর মধ্যে ওই দুই শিশুর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। মাকে হারিয়ে তারা হাসপাতালে হামের সঙ্গে লড়াই করছে। আর তাদের পরিবারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে চিকিৎসা, পুষ্টি ও বেঁচে থাকার কঠিন বাস্তবতা।

সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ‘হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের কারও শারীরিক অবস্থা বর্তমানে জটিল নয়। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত পাঁচ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা তুলনামূলকভাবে জটিল এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বান্দরবান সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত ১৫ জন শিশু, ছয় জন নারী এবং তিন জন পুরুষ চিকিৎসাধীন।’