এক জেলায় ‌মাসে ‘ট্রাফিক পুলিশের’ নামে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়

কক্সবাজারে পরিবহন খাতে চলছে সীমাহীন চাঁদাবাজি। শুধুমাত্র সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে মাসে আদায় করা হচ্ছে ২০ লাখ টাকার বেশি। পাশাপাশি অন্যান্য তিন চাকার যান ও মিনিবাস এবং রেজিস্ট্রেশনবিহীন গণপরিবহন থেকে আরও ১০ লাখ টাকার বেশি চাঁদা তোলা হয়। একটি সিন্ডিকেট প্রতিটি গাড়ি থেকে ‘লাইন’ খরচের নামে এসব টাকা উত্তোলন করছে। অবৈধভাবে আদায় করা এসব টাকা ট্রাফিক পুলিশের নামে তুলে অধিকাংশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দিচ্ছে। সিন্ডিকেটের একাধিক সদস্য বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং ট্রাফিক পুলিশও যে টাকার ভাগ নিচ্ছে, তারও তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার শহরের দেবানল পাল ওরফে নিউটন, বাহারছড়া এলাকার শাহাজান ও খুরুশকুলের সাহাব উদ্দিনের নেতৃত্বে এসব চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। আদায়কৃত চাঁদা কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশের টিএসআই ফরহাদের নেতৃত্বে অন্তত ২০ জন দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দিচ্ছে প্রতি মাসে। এভাবে শহরের সড়ক ও বিভিন্ন অন্তঃসড়কে চলাচলরত ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন গাড়িচালক ও মালিকদের কাছ থেকে মাসে ১৮০০-২০০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। 

শহরের বাস টার্মিনাল এলাকায় বসবাসরত নিরঞ্জন পালের ছেলে দেবানল পাল ওরফে নিউটন, শহরের বাহারছড়া এলাকার শাহাজান ও খুরুশকুলের সাহাব উদ্দিন পুরো জেলার গাড়িতে চাঁদার নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছেন। মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলে ট্রাফিক পুলিশের ভাগ-বাঁটোয়ারার সমন্বয়ক টিএসআই ফরহাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। টিএসআই ফরহাদ প্রত্যেক ট্রাফিক সদস্যের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন এই টাকা। 

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শহরের প্রধান সড়কের ভোলাবাবুর পেট্রোল পাম্পকেন্দ্রিক একটি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট এসব টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। শহরের প্রধান সড়কের পাশে অবৈধভাবে সিএনজি পার্কিং স্টেশন করে প্রতিটি গাড়ি থেকে দিনে ৪০ টাকা করে আদায় করছেন মোহাম্মদ বেলাল নামের এক লাইনম্যান। 

শহরের প্রধান সড়কের ভোলাবাবুর পেট্রোল পাম্পকেন্দ্রিক একটি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট এসব টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে লাইনম্যান মোহাম্মদ বেলালের নেতৃত্বে একটি চক্র কিছু অসাধু ট্রাফিক পুলিশের সহায়তায় শহরের ব্যস্ততম এই এলাকা দখল করে সিএনজি পার্কিং স্টেশন গড়ে তোলে। ওই স্টেশনে আসা প্রতিটি সিএনজি অটোরিকশা থেকে ৪০ টাকা করে মাসে কয়েক লাখ টাকা আদায় করছেন। একই টাকা নিচ্ছেন অন্যান্য পরিবহন থেকেও। এভাবে অন্তত ৫ হাজারের বেশি গাড়ি থেকে টাকা তুলছেন। এসব টাকা ট্রাফিক সার্জেন্ট, টিএসআই থেকে শুরু করে সিন্ডিকেট সদস্যরা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। 

সিএনজি অটোরিকশা চালকরা বলছেন, শহরে গাড়ি নিয়ে ঢুকলেই বেলাল সিন্ডিকেটকে লাইন খরচ ২০ টাকা আর পৌরসভার খরচ ২০ টাকাসহ মোট ৪০ টাকা দিতে হয়। এভাবে প্রতিদিন টাকা তোলা হয়।

সিন্ডিকেটের প্রধান মোহাম্মদ বেলাল চাঁদা আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটি লাইন খরচের টাকা। গাড়িগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে সিরিয়াল দিয়ে ২০ টাকা করে নিচ্ছি।’ 

জন চলাচলের রাস্তা দখল করে সিএনজি পার্কিং স্টেশনের কোনও সরকারি অনুমতি আছে কিনা জানতে চাইলে বেলাল বলেন, ‘আমরা কয়েকজন মিলে করছি। চলতে হবে তো। এটা নিয়ে নিউজ করার কী আছে।’  

মাসিক চুক্তিতে চাঁদা আদায়কারী অভিযুক্ত দেবানল পাল ওরফে নিউটনও চাঁদাবাজির কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা টাকা নিই। সব টাকা তো আমরা নিই না। ট্রাফিকের দায়িত্বে নিয়োজিত টিআই, টিএসআই, সার্জেন্টসহ অন্তত ২০ জন পুলিশকে ম্যানেজ করতে হয়। এই টাকাগুলো কী আমার বাবার সম্পত্তি বিক্রি করে দেবো? অবৈধ গাড়ি শহরে ঢুকলে ট্রাফিক পুলিশ ধরে, এজন্য আগেই টাকা দিতে হয়।’

নিউটন আরও বলেন, ‘এখন আগের মতো সুবিধা নেই। আমার টাকায় ভাগ বসিয়েছে বাহারছড়া এলাকার শাহাজান। এখন তিনি নিজে নিজে লাইন চালায়। অথচ পুলিশের সবাইকে ম্যানেজ করতে হয় আমাকে।’ 

জানতে চাইলে শাহাজান ও সাহাব উদ্দিন জানান, একসময় আমরা লাইন চালাইতাম পুরো ট্রাফিক বিভাগকে ম্যানেজ করে। এতে প্রতি মাসে এককালীন ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা দিলে হয়ে যেতো। আর এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাঠপর্যায়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের সরাসরি মাসোহারা দিয়ে লাইন চালাতে হয়। মানে ট্রাফিকের টিআইদের ৩০ হাজার, সার্জেন্ট ও টিএসআইদের ২০ থেকে ২৫ হাজার করে দিতে হয়। এভাবে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা খরচ করে অবশিষ্ট টাকা আমাদের মধ্যে ভাগ হয়। তবে ম্যানেজের বাইরে ট্রাফিকের অ্যাডমিন, এএসপি, এসপির রোষানলে পড়লে পুলিশ লাইন থেকে নিজ খরচে গাড়ি ছাড়িয়ে আনতে হয়। তখন গাড়ির মালিককে কোনও খরচ বহন করতে হয় না। আমরা পুলিশকে টাকা দিয়ে গাড়ি ছাড়িয়ে আনি।

ট্রাফিক পুলিশের নামে এই চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে টিএসআই ফরহাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি বেশি দিন হয়নি। কথা হচ্ছে ওই টাকা সবাই নিলে আমি নেবো না কেন? কক্সবাজারে চাকরি করা কঠিন। একপ্রকার বাধ্য হয়ে নিতে হয় আরকি।’

এসব টাকা ট্রাফিক সার্জেন্ট, টিএসআই থেকে শুরু করে সিন্ডিকেট সদস্যরা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন

অনুসন্ধানে জানা যায়, নিউটন ও শাহাজানের কাছ থেকে মাসে সরাসরি মাসোহারা নেন ট্রাফিক পুলিশের টিআই রোবায়েত ৩০ হাজার, টিএসআই মাইন উদ্দিন ৩০ হাজার, টিএসআই রাসেল ২০ হাজার, টিআই পরান (এখন টেকনাফে) ২০ হাজার, ফারুক ২০ হাজার, ফয়সাল ২০ হাজার, রাজু ২০ হাজার, সদীপ ২০ হাজার, টিআই জানে আলমসহ তিন জনের নামে ১ লাখ ২০ হাজার হাজার টাকা, টিএসআই মিজান ১৫ হাজার, সুভাস ২০ হাজার, আহসান ১৫ হাজার, প্রদীপ ১৫ হাজার, আবু হানিফ ১২ হাজার, স্বপন ১০ হাজার, তোফায়েল ১৩ হাজার, কনস্টেবল সাজ্জাদ ৫ হাজার, ইউছুফ ৫ হাজার, আতিকুল ৫ হাজার, জাকির ৫ হাজার, হাসান ৫ হাজার, জহির ৫ হাজার ও কামরুল ৫ হাজার টাকা নিচ্ছেন।

এসব পুলিশ সদস্য শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়ে ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশনবিহীন ও লাইসেন্সবিহীন সিএনজি অটোরিকশা আটক করেন। পরে নিউটন, শাহাজান ও সাহাব উদ্দিনের ফোন কলে ছেড়ে দেন। আবার তারা যখন ফোন দিয়ে বলেন ‘কোম্পানির গাড়ি’ তখন দ্রুত গাড়ি ছেড়ে দেন। এভাবে মাসের পর মাস লাখ লাখ টাকা আদায় করলেও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোনও ব্যবস্থা নেন না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশের টিআই (অ্যাডমিন) মো. খসরু পারভেজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ আমার জানা নেই। যদি এই রকম কোনও পুলিশ সদস্য অপকর্মে লিপ্ত থাকেন, তাহলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’

এ বিষয়ে জানতে কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমানের মোবাইল নম্বরে একাধিক দিন ফোন দিলেও রিসিভ না করার তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের কোনও সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি আমি সিরিয়াসলি দেখছি।’