বান্দরবানে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের নিজস্ব ভবন নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ ও ভবন নির্মাণের স্থান নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণের জন্য ৩০ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হলেও সেখানে ভবন নির্মাণ না করে পাশের সরকারি খাস পতিত জমিতে মাটি ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। আর ভবন নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা জমিতে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছেন পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বান্দরবান সদর ইউনিয়নের রেইচা এলাকায় পিটিআইয়ের পূর্ব পাশে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য ২০১৬ সালের দিকে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে চারতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কাজটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর মাসখানেক আগে আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিগ্রহণ করা ৩০ শতক জমিতে ভবন নির্মাণ না করে তার পাশের একটি সরকারি খাস পতিত জমিতে মাটি ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ভবনের মাটির নিচের পাইলিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে চলছে প্রথমতলার নির্মাণকাজ।
অপরদিকে, ভবন নির্মাণের জন্য সরকারি অর্থে অধিগ্রহণ করা প্রায় ৩০ শতক জমি পড়ে রয়েছে পাশেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জমিটি নিজেদের দখলে রেখেছেন। সেখানে বড় একটি পুকুর খনন করে মাছ চাষ করা হচ্ছে।
অধিগ্রহণের জমিতে ভবন না করে অন্য জায়গায় কেন?
স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে কোটি টাকা ব্যয়ে যে জমি অধিগ্রহণ করেছে, সেই জমিতে ভবন নির্মাণ না করে পাশের খাস জমিতে কেন ভবন করা হচ্ছে? অধিগ্রহণ করা জমিটিরই বা এখন কী হবে? একই সঙ্গে ওই জমি যদি অফিসের কাজে প্রয়োজন না হয়, তাহলে সরকারি কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে দীর্ঘদিন ধরে সেটি ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কেন—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্মাণকাজের ঠিকাদার মোজাফ্ফর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাজটি ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আগের ঠিকাদার চলে যাওয়ায় কাজটি প্রায় দুই বছর বন্ধ ছিল। বর্তমানে কাজটি কিনে নিয়ে নতুন করে নির্মাণকাজ শুরু করেছি।’
অধিগ্রহণ করা জায়গায় ভবন নির্মাণ না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অধিগ্রহণ করা জায়গায় ভবন নির্মাণ করা না হলেও পাশের লাগোয়া জায়গাতেই ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে দোষের কিছু নেই। বরং অধিগ্রহণ করা জায়গার চেয়ে বর্তমান জায়গাটি আরও বেশি সুন্দর।’
তবে ঠিকাদারের এমন বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন স্থানীয় লোকজন। রেইচা এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী কাসেম বলেন, ‘সরকারি অধিগ্রহণের জায়গায় পরিবার পরিকল্পনার অফিস নির্মাণ না করে অন্য জায়গায় করা হচ্ছে। আর অধিগ্রহণ করা জায়গায় মাছ চাষ করা হচ্ছে। এমনটি কখনও শুনিনি। আসলেই সরকারি লোকেরা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে।’
অধিগ্রহণের জায়গা এটি নয়
রেইচার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার নুরুন্নবী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণের সময় আলোচনা সভায় আমি নিজে ছিলাম। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ফাইলে স্বাক্ষর করে সাক্ষীও হয়েছিলাম। যে জায়গায় ভবন নির্মাণ হচ্ছে, এটি অধিগ্রহণের জায়গা নয়। অধিগ্রহণের জায়গা পিটিআইয়ের পূর্ব দিকে, যেখানে একটি পুকুর রয়েছে।’
অধিগ্রহণ করা জমির মালিকের ছেলে চেহিং মারমার অভিযোগ, পিটিআইয়ের পূর্ব পাশের জায়গাটি অধিগ্রহণ করা হলেও ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে পিটিআইয়ের সামনের অংশে। সেটিও তাদের জায়গা বলে দাবি করেন তিনি।
চেহিং মারমা বলেন, ‘কর্মকর্তারা এসে জোর করে দখল করে এখানে ভবন নির্মাণ করছেন। আবার অধিগ্রহণ করা জায়গাটিও দখলে রেখেছেন।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমানে যে জায়গায় ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটি নিচু ছিল। তাকে দিয়ে সেখানে মাটি ভরাট করানো হয়েছে এবং মাটি ভরাটের জন্য দেওয়া আড়াই লাখ টাকাও কর্মকর্তারা আত্মসাৎ করেছেন।
তার দাবি, অধিগ্রহণের পুরো টাকাও আমাদের দেওয়া হয়নি। অর্ধেক কর্মকর্তারাই নিয়ে গেছে। এসব নিয়ে কার কাছে বিচার দেবো?
দাগ নিয়ে একটু ওলটপালট হয়েছে
এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের সাবেক উপপরিচালক ডা. অংচালু মারমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে দুই দাগে জায়গা কেনা হয়েছে। দাগ নিয়ে কিছুটা ওলটপালট হয়েছে। তবে ভবন নির্মাণ হচ্ছে, এটিও ভবনের জায়গা। ওদিকেরটাও ভবনের জায়গা।’
বিষয়টি তদন্ত হলে অনিয়মের সঙ্গে অনেকেই জড়িত হতে পারেন—এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি নিয়ে তদন্ত হলে আমি একা না, অফিসের আরও অনেকেই বিপদে পড়বে। কারণ এতে অনেকেই জড়িত।’
বিষয়টি স্বীকার করলেন বর্তমান উপপরিচালক
পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের উপপরিচালক ডা. লেনিন তালুকদার (ভারপ্রাপ্ত) বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তিনি জমি অধিগ্রহণের সময় দায়িত্বে ছিলেন না। কাজ শুরু হওয়ার পর তিনি দায়িত্বে এসেছেন।
অধিগ্রহণ করা জায়গায় অফিস ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে না—বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আপনি অফিসে আসেন, তখন বিস্তারিত আলাপ করা হবে।’ তবে পরবর্তীতে কয়েকবার অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।
এলএ শাখার বক্তব্যেও মিললো অভিযোগের সত্যতা
এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় যোগাযোগ করা হলে তারাও জানায়, ভূমি অধিগ্রহণ করা জায়গায় অফিস ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে না।
ফলে সরকারি অর্থে অধিগ্রহণ করা জমি পড়ে থাকা, সেখানে মাছ চাষের অভিযোগ এবং পাশের খাস জমিতে পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের ভবন নির্মাণ—সব মিলিয়ে জমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণকাজের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি অর্থে অধিগ্রহণ করা জমির ব্যবহার এবং ভবন নির্মাণের স্থান পরিবর্তনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।