চাঁদপুরে ৩ বিচারকের আদালত বর্জনের ঘোষণা আইনজীবীদের

বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনজীবীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ তুলে চাঁদপুরের তিন বিচারকের আদালত অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন জেলা আইনজীবীরা। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জেলা আইনজীবী সমিতির জরুরি সাধারণ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে আদালতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শুনানির সময় আইনজীবী নেতাদের বেআইনি আবদার না রাখায় এবং আদালতের ওপর প্রভাব বিস্তারে ব্যর্থ হয়ে তারা আদালত বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সভায় জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শামছুল ইসলাম মন্টু পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১ এবং সদর সিনিয়র সিভিল জজ আদালত বর্জনের ঘোষণা দেন।

যে তিন বিচারকের আদালত বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে তারা হলেন—চাঁদপুরের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুজাহিদুর রহমান, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এর বিচারক পলাশ বর্ধ্বন এবং সদর সিনিয়র সিভিল জজ শম্পা ইসলাম।

অ্যাডভোকেট শামছুল ইসলাম মন্টু বলেন, এসব বিচারকের সঙ্গে আইনজীবীদের সমন্বয়হীনতা দীর্ঘদিনের। বিষয়গুলো নিয়ে আইনজীবী সমিতির নেতারা তাদের মৌখিকভাবে অবহিত করলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং নিজেদের মতো করে বিচারকার্য পরিচালনার কারণে আইনজীবীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এ কারণে আদালত বর্জনের মতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে সমিতি।

তিনি আরও বলেন, শুধু এই তিনটি আদালত নয়, আরও কয়েকটি আদালত এবং সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালতেও আইনজীবীদের সঙ্গে ‘শিক্ষক-ছাত্রের মতো’ আচরণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও আইনজীবীদের হয়রানির শিকার হতে হয় বলে দাবি করেন তিনি।

এসব সমস্যা সমাধানে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনায় বসার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান বার সভাপতি। পাশাপাশি আইনজীবীদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত ও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, আগামী সাত দিন কোর্ট পুলিশ পরিদর্শকের দফতর থেকে মামলার কপির জন্য কোনও অর্থ দেওয়া হবে না। আদালতের পেশকারসহ সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন আচরণে আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে অসম্মানিত হয়ে আসছেন বলেও সভায় অভিযোগ করা হয়।

অ্যাডভোকেট শামছুল ইসলাম মন্টু বলেন, স্থানীয়ভাবে সমস্যার সমাধান না হলে লিখিতভাবে সব সমস্যা তুলে ধরে বার কাউন্সিলকে জানানো হবে। পাশাপাশি সমিতির সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনও আইনজীবী বা তার সহকারী কাজ করলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন তালুকদার ফয়সালের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট কোহিনুর রশিদ, জিপি এজেএম রফিকুল হাসান রিপন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি কোহিনুর বেগম, আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ইকবাল বিন বাশার, সেলিম আকবর, আহছান হাবীব, একিউএম মোস্তফা কামাল, আবুল খায়ের মো. সালেহ, সাবেক পিপি আমান উল্যাহ (১) ও মো. জসিম মেহেদী।

এছাড়া আইনজীবীদের মধ্যে জাকির হোসেন, তাফাজ্জল হোসেন, মহসিন খান, সলিম উল্যাহ সেলিম, বাপ্পি, আলম খান মঞ্জু, আব্দুল লতিফ শেখ, শাহ আলম ফরাজী, নাইমুল ইসলাম, আক্তার সরকার, কামাল উদ্দিন আহমেদ, গোলাম মোস্তফা, গাজী দুলাল ও সাদ্দাম হোসেন বক্তব্য দেন।

সভায় বক্তারা বলেন, বিচারপ্রার্থীদের সেবা দিতে গিয়ে আইনজীবীরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে বিচারকদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে চান বলেও জানান তারা।

আদালতের বক্তব্য

এদিকে তিন বিচারকের আদালত বর্জনের বিষয়ে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে একটি লিখিত বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন আদালতের নাজির মো. ফখরুদ্দিন স্বপন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সকাল থেকেই বিভিন্ন মামলার প্রয়োজনে আসা বিচারপ্রার্থীরা বিচারকক্ষের সামনে অপেক্ষা করছিলেন। দুপুরের পর আদালতের বিচারকরা বিচারিক কার্যক্রম শুরু করলেও আইনজীবীদের অনুপস্থিতির কারণে অনেক মামলার শুনানি পিছিয়ে যায় এবং নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জামিন আবেদনের বিষয়ে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও পিপিকে আগে অবহিত করার বিষয় এবং সিনিয়র সিভিল জজ আদালতের একটি নিষেধাজ্ঞার শুনানিতে আইনজীবী নেতাদের ‘বেআইনি আবদার’ না রাখায় তিনটি আদালত বর্জন করা হয়েছে।

আদালতের দাবি, মূলত আদালতের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পেরে আইনজীবী নেতারা মূল ঘটনা আড়াল করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত আইনজীবী সমিতির একাংশের আইনজীবীরা সাধারণ সভা করে তিনটি আদালত বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

আদালত বর্জনের আইনগত ভিত্তি নেই দাবি করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এমন ‘নজিরবিহীন’ ঘটনায় আদালতপাড়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।