নোয়াখালীর হাতিয়ায় শ্রেণিকক্ষে হঠাৎ ঝাঁজালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় আবারও ২০ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। অসুস্থদের মধ্যে একজনের অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে নোয়াখালী জেলা সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলার তমরদ্দি জোড়খালী উচ্চবিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর একই বিদ্যালয়ে ঝাঁজালো গন্ধে ২৭ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়েছিল।
তাদের মধ্যে ১৩ জনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছিল। ওই ঘটনার পরদিন উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসক ও পুলিশ কর্মকর্তারা বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রাথমিকভাবে পাওয়া আলামতের ভিত্তিতে ধারণা করেছিলেন, ধানক্ষেতে ছিটানো কীটনাশকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে থাকতে পারে। তবে আজ একইভাবে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকাল ১০টার দিকে বিদ্যালয়ে পাঠদান শুরু হয়। এর প্রায় এক ঘণ্টা পর নবম শ্রেণির দুই ছাত্রী হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর অন্য শ্রেণিকক্ষের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময় কয়েকজন অজ্ঞান হয়ে যায়। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় অসুস্থ শিক্ষার্থীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। দুপুর ২টা পর্যন্ত ২০ শিক্ষার্থীকে সেখানে ভর্তি করা হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, ‘বেলা ১১টার দিকে জোড়খালী উচ্চবিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক আমাকে ফোন করে জানান, আগের ঘটনার মতো বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পরামর্শ দিই। ২০ শিক্ষার্থীকে অসুস্থ অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসা এবং অসুস্থতার কারণ অনুসন্ধানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাকে জেলা সদরের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, অসুস্থ এক ছাত্রীকে (১৪) নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পাঁচ জন বিকালে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। অন্যরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্তব্যরত উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা (স্যাকমো) বিমান চন্দ্র আচার্য বলেন, ‘অসুস্থ শিক্ষার্থীদের উপসর্গ প্রায় একই রকম—মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব ও অচেতন হয়ে যাওয়া। প্রাথমিকভাবে এটিকে গণহিস্টিরিয়া বা গণমনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতা বলে মনে করছি। তবে জেলা সদরে পাঠানো শিক্ষার্থীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর বিষয়টি সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
জেলা সিভিল সার্জন ও জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘হাতিয়ার একটি বিদ্যালয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া এক ছাত্রীকে জেনারেল হাসপাতালে আনার পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাকে মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, এটি গণহিস্টিরিয়া হতে পারে।’
ইউএনও রাসেল ইকবাল বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা বারবার শ্রেণিকক্ষে অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে আজ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। বিষয়টি সম্পর্কে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) দৃষ্টি আকর্ষণ করে চিঠি দেবো।’
খবর পেয়ে অসুস্থ শিক্ষার্থীদের দেখতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন। এ সময় হাসপাতালে স্বজন ও সাধারণ মানুষের ভিড় জমে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ওসি কবির হোসেন জানান, সংবাদ পাওয়ার পর তিনি হাসপাতালে এসেছেন। বিষয়টি বারবার কেন ঘটছে, তা চিকিৎসাবিষয়ক তদন্তের পাশাপাশি এখানে ফৌজদারি কোনও অপরাধ আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে।