এক মণ্ডপেই ১০১ প্রতিমা, আছে মহাবিশ্বের চার কালের কাহিনিও

সারি সারি ছোট বড় প্রতিমা। দেবদেবীর নানা রূপ। একটি-দুটি নয়; এক ছাদের নিচে ১০১টি প্রতিমা। সনাতন ধর্মে কালচক্র বা মহাবিশ্বের সময়কাল চারটি যুগে বিভক্ত: সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি—এই চার যুগের ধর্মীয় ও পৌরাণিক নানা উপাখ্যান ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রতিমার শৈল্পিক রূপান্তরের মাধ্যমে। 

এই বিশাল আয়োজনে ঠাঁই পেয়েছে সরস্বতী, শিব, রাধা-কৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, লক্ষ্মী-নারায়ণ, রাম-সীতা, হনুমান, কপূতা রাক্ষসী, কুম্ভকর্ণ, জগদ্ধাত্রী, কালী, মনসাসহ বিভিন্ন দেব-দেবী ও পৌরাণিক চরিত্র। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছে যশোর শহরতলির চাঁচড়া বর্মনপাড়া শ্রীহরি মন্দিরে।

মৃৎশিল্পীদের টানা দুই মাসের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় কাঁচা মাটির কাঠামো প্রাণ ফিরে পাচ্ছে এসব প্রতিমা। শেষ সময়ে চলছে রঙের কাজ। চার যুগের আবহ নিয়ে তৈরি এই ব্যতিক্রমী মণ্ডপ শুধু স্থানীয়দের মধ্যেই উচ্ছ্বাস জাগায়নি, বরং শরতের শুভ্রতা, ঢাকের বাদ্য আর প্রতিমার বৈচিত্র্যে দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীদেরও দারুণভাবে আকৃষ্ট করবে।

মন্দির কর্তৃপক্ষের আশা, এই আয়োজন সনাতন ধর্মের নতুন প্রজন্মকে তাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে সাহায্য করবে। দিনরাত পরিশ্রমে এখন উৎসবের অপেক্ষায় প্রতিমাশিল্পীরা। যা দেখতে ইতোমধ্যে দূরদূরান্ত আসছেন ভক্তবৃন্দ।  

প্রতিমা ও আয়োজন দেখতে আসা শিপ্ৰা বর্মন বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর অন্য এলাকায় যাই প্রতিমা দেখতে। এবার আমাদের গ্রামে এত সুন্দর একটা পূজা হচ্ছে, অনেক বড় আয়োজন। আমাদের অনেক দিনকার স্বপ্ন ছিল এটি। অনেক দিন আমাদের মনে আশা ছিল। ভগবান এবার আমাদের সেই আশাটা পূর্ণ করেছেন। তাই আমরা অনেক খুশি।’ 

দীপাঙ্কর বর্মন বলেন, ‘আমাদের বর্মনপাড়াতে ১০১টি প্রতিমার মাধ্যমে সনাতন ধর্মের চার যুগ তুলে ধরা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে হিন্দু ধর্মের যুগে যুগে পরিবর্তন এটা দেখে ভালো লাগছে এবং নতুন কিছু শিখতে পারছি।’

চার যুগের ধর্মীয় ও পৌরাণিক নানা উপাখ্যান ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রতিমার শৈল্পিক রূপান্তরের মাধ্যমে

বর্মনপাড়া গ্রাম উন্নয়ন কমিটি সাধারণ সম্পাদক শিমুল বর্মন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারা বিশ্বে যে একটা অশান্তি চলছে; আমরা শান্তির বার্তা দেওয়ার জন্য এই থিমটা তৈরি করেছি। সনাতনীদের চারটি যুগ আছে; সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি, এই যুগ অনুসারে দুষ্টুদের দমন করার জন্য যুগে যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হন, সেই ভাবটা আমরা এখানে প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। অনেক দর্শনার্থী আসা শুরু করে দিয়েছেন। আশা করছি, এখানে ব্যাপক লোকসমাগম ঘটবে।’

মন্দিরটিতে প্রতিমা তৈরির কারিগর আকাশ মণ্ডল বলেন, ‘চার যুগের কাহিনিতে দুই মাস ধরে প্রতিমাগুলো তৈরি করেছি। ইতোমধ্যে রঙের কাজও শেষের দিকে। রাতদিন কাজ করছি। কিছুটা সাজসজ্জার কাজ বাকি রয়েছে। দর্শনার্থীরা দেখতে এসে যখন কাজের প্রশংসা করছে; তখন আনন্দ উদ্বেলিত করছে।’

শারদীয় দূর্গোৎসব ঘিরে চাঁচড়ার এমন ব্যতিক্রম প্রতিমার আয়োজনের পাশাপাশি যশোরের আট উপজেলায় এবার ৭৪৩টি মন্দির মণ্ডপে চলছে দুর্গাপূজার আয়োজন। সেগুলোতেও চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। বিভিন্ন মণ্ডপে চলছে এখন প্রতিমা তৈরি ও সাজসজ্জার কাজ। অনেকেই বায়না দেওয়া প্রতিমা নিতেও আসছেন। 

ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছে যশোর শহরতলির চাঁচড়া বর্মনপাড়া শ্রীহরি মন্দিরে

যশোর শহরের বেজপাড়া সর্বজনীন পূজা মন্দিরের শিল্পী শংকর মন্ডল জানান, এবার তিনি ৩৭টি প্রতিমা তৈরি করছেন। সময়মতো সরবরাহ দিতে রাত-দিন কাজ করছেন।  

গত বছরের চেয়ে এবার ২৮টি বেশি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পূজা উদযাপন পরিষদ যশোরের সভাপতি দীপাঙ্কর দাস রতন। তিনি বলেন, ‘তবে কোনও মণ্ডপে ডিজে না বাজিয়ে ভক্তিগীতি বাজানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি মন্দিরের জন্য হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে সম্প্রীতি কমিটি গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ 

এদিকে জেলার মণ্ডপগুলোতে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা নেই। শঙ্কাহীন পরিবেশে যেন নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’