সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রবিবার (১ নভেম্বর) থেকে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার কথা সেন্টমার্টিন দ্বীপ। তবে পর্যটন মৌসুমের প্রথম দিনেও দ্বীপের উদ্দেশে ছেড়ে যায়নি কোনও পর্যটকবাহী জাহাজ। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আগামী ৫ বা ৬ নভেম্বর থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে।
সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি কার্যক্রম শেষ না হওয়ায় জাহাজ চলাচল কয়েক দিন পিছিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশা, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আগামী সপ্তাহের শুরুতেই পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের গত ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন। প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে।
পর্যটন মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে সেন্টমার্টিন দ্বীপজুড়ে চলছে প্রস্তুতি। হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁয় সংস্কার, রং করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নতুন সাজসজ্জার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দীর্ঘদিন পর্যটক সংকটে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়া ব্যবসায়ীরা নতুন মৌসুম ঘিরে আশাবাদী।
অন্যদিকে, পর্যটক পরিবহনের জন্য সেন্টমার্টিন জেটি ও কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া জেটিঘাট প্রস্তুত করার কাজ চলছে। জাহাজ মালিকদের সংগঠন বলছে, সেন্টমার্টিন জেটি পর্যটকবাহী জাহাজ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকলেও নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটে যাত্রী ওঠানামার জন্য প্রয়োজনীয় সিঁড়ির সংখ্যা এখনও পর্যাপ্ত নয়।
সেন্টমার্টিন নৌপথে চলাচলকারী পর্যটকবাহী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, সেন্টমার্টিন জেটির প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তবে নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটে যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামা নিশ্চিত করতে আরও একটি সিঁড়ি স্থাপন করা জরুরি।
তিনি জানান, পরিবেশ অধিদফতরের অনুমোদন পাওয়ার পর বিআইডব্লিউটিএর নির্দেশনা ও শর্ত পূরণের ভিত্তিতে এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বার আউলিয়া ও এমভি টেকনাফ এই তিনটি পর্যটকবাহী জাহাজকে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া থেকে সেন্টমার্টিন নৌপথে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে অন্য জাহাজগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনও চলমান।
কক্সবাজার নদীবন্দরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক নয়ন শীল বলেন, নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটের অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ। সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে, যা এক-দুই দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হবে।
এদিকে পর্যটকদের আগমন ঘিরে সেন্টমার্টিনের পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর্যটক চলাচলে সীমাবদ্ধতা এবং রাতযাপনে বিধিনিষেধ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। নতুন মৌসুমে সেই ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠার আশা করছেন তারা।
সেন্টমার্টিনের একটি রিসোর্টের মালিক মোহাম্মদ তৈয়ব উল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন ব্যবসা প্রায় বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন পর্যটক আসার খবর তাদের জন্য নতুন আশার বার্তা হয়ে এসেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আলমগীর আকাশ বলেন, সেন্টমার্টিনের ব্যবসা মূলত দুই থেকে তিন মাসের মৌসুমনির্ভর। এই সময়ের আয়ের ওপরই পুরো বছরের জীবিকা নির্ভর করে। তাই কোনও কারণে পর্যটন কার্যক্রম ব্যাহত হলে স্থানীয় মানুষের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ সংস্কারের জন্য তিন শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে পর্যায়ক্রমে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দ্বীপে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল ও পর্যটনসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে প্রস্তুতির মধ্যেও জাহাজ ভেড়ানোর পন্টুনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে পন্টুনের বিভিন্ন স্থানে মরিচা ধরে ক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটক চলাচল শুরুর আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে যাত্রী ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাকের আলম বলেন, জেটির মূল কাঠামো প্রস্তুত থাকলেও পন্টুনের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত এটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সেন্টমার্টিন হোটেল মালিক-ব্যবসায়ী সমিতির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি আব্দুর রহমান বলেন, পর্যটকদের আগমন শুরু হলে দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্যে আবারও গতি ফিরবে। এতে পর্যটননির্ভর হাজারো মানুষের জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের অধিকাংশ হোটেল ও রেস্তোরাঁর সংস্কারকাজ শেষ পর্যায়ে। তবে পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে জেটির পন্টুন দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন।
কক্সবাজার জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন জানান, প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে জেটির উন্নয়নকাজ চলছে। কিছু কাজ এখনও বাকি থাকলেও জাহাজ চলাচল শুরুর আগেই প্ল্যাটফর্মসহ প্রয়োজনীয় অংশ ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি নির্মাণকাজ নিয়ে ওঠা অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবারের পর্যটন মৌসুম পরিচালনা করা হবে। হোটেল-রিসোর্ট সংস্কারের আবেদন যাচাই করে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।