নিষেধাজ্ঞার সুফল কই, কেন এত কমলো ইলিশের উৎপাদন

ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, জাটকা সংরক্ষণে দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ—উদ্দেশ্য একটাই, ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়ানো। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে নেওয়া এসব কর্মসূচির সুফলও মিলেছে। গত দুই দশকে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। তবে সেই ধারায় এখন ছেদ পড়েছে। সর্বশেষ দুই অর্থবছরেই কমেছে ইলিশের উৎপাদন। এতে প্রশ্ন উঠেছে, নিষেধাজ্ঞার সুফল কি ধরে রাখা যাচ্ছে? নাকি বাস্তবায়নের দুর্বলতা ও নদীর পরিবেশগত পরিবর্তন ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির পথ বাধাগ্রস্ত করছে?

আবার সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু নিষেধাজ্ঞা আর অভিযান চালিয়ে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন মৎস্য গবেষক ও সংশ্লিষ্টরা।

মৎস্য গবেষকদের ভাষ্যমতে, ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির জন্য মা ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া এবং জাটকাকে বড় হওয়ার সময় দেওয়া জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, অমাবস্যা ও পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে ইলিশের ডিম ছাড়ার প্রবণতা বাড়ে। এ সময় মা ইলিশের পেটে পরিপক্ব ডিম থাকে। তাই প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ইলিশের ছোট পোনাগুলোকে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে জাটকা সংরক্ষণে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

তবে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মা ইলিশ রক্ষায় গত ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার ১৫ দিন চাঁদপুরের নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স অভিযান চালালেও বিশাল নদী এলাকায় তা তুলনামূলক সীমিত। সুযোগ পেলেই নদীতে নামছেন অসাধু জেলেরা। নদীতে দেখা যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ জাল। পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় ২৪ ঘণ্টা অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি কোনও কোনও এলাকায় অভিযানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতায় ইলিশ শিকারের অভিযোগও আছে।

ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা, সুফল ধরে রাখা যাচ্ছে না

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিশাল নদীসীমায় সীমিত সামর্থ্য নিয়েই অভিযান সফল করতে আমরা চেষ্টা করছি। এ ক্ষেত্রে মৎস্যজীবী ও জেলেদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে হবে।

কীসের আলোকে নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করা হয়

ইলিশ মাছের নিরাপদ প্রজনন, ডিম ছাড়ার সময় এবং জাটকা (ছোট ইলিশ) বেড়ে ওঠার জীবনচক্রের আলোকে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করা হয়। আবার নিষেধাজ্ঞার সময় সাধারণত দুই ভাগে নির্ধারিত হয়।

মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান

মা ইলিশের পূর্ণাঙ্গ প্রজনন ও ডিম ছাড়ার প্রধান সময়কে (সাধারণত আশ্বিন মাসের পূর্ণিমার আগে-পরে মিলিয়ে ২২ দিন, যেমন ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর) সামনে রেখে এই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

জাটকা সংরক্ষণ অভিযান

মা ইলিশ থেকে ফোটা ইলিশের পোনা বা জাটকা (২৫ সেন্টিমিটারের কম সাইজের ইলিশ) উপকূলীয় নদী ও মোহনায় ৫ থেকে ৮ মাস নিরাপদভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে ৮ মাসব্যাপী (নভেম্বর থেকে জুন মাস পর্যন্ত) নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

নিষেধাজ্ঞা আছে, তবু কমছে ইলিশের উৎপাদন

কী বলছেন ইলিশ গবেষকরা

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নদী কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইলিশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। বিভিন্ন প্রকল্পের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একসময় ইলিশের প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল সেপ্টেম্বর মাস। পরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সেই সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। এ কারণে মা ইলিশ রক্ষার অভিযান এখন অক্টোবরে পরিচালিত হচ্ছে। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সময় নির্ধারণ করেছেন গবেষকরা।’

তিনি বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় একটি অমাবস্যা ও একটি পূর্ণিমাকে সামনে রেখে ২২ দিন নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখার প্রস্তাব করেছিল মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। সরকার সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করছে। এর লক্ষ্য ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো। গবেষণায় দেখা গেছে, এ সময়ে মা ইলিশের পেটে প্রচুর পরিপক্ব ডিম থাকে। এ সময় জেলেদের জালে অনেক ডিমওয়ালা মা ইলিশ ধরা পড়ে। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় ইলিশের প্রাপ্যতাও বেড়ে যায়। তাই এ সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

নিষেধাজ্ঞার সুফল কই

ইলিশের প্রাপ্যতা কমার বিষয়ে তিনি বলেন, ২০০০ সালের পর একসময় দেশে ইলিশের উৎপাদন বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক কম ছিল। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে মা ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া এবং পরে পোনাগুলোকে বড় হওয়ার সুযোগ করে দিতে জাটকা সংরক্ষণের কর্মসূচি নেওয়া হয়। এর ফলে পরবর্তী সময়ে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। তবে নদীদূষণ বৃদ্ধি ও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার কারণে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সেইসঙ্গে জলবায়ুর প্রভাবও আছে।

ইলিশের উৎপাদনে ভাটা, প্রশ্নে নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা

ইলিশ কখন ডিম ছাড়ে

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বছরের ১২ মাসে ১২টি অমাবস্যা ও পূর্ণিমা হয়। এর মধ্যে পূর্ণিমায় ইলিশ বেশি ডিম ছাড়ে। কিন্তু সারা বছর মাছ ধরা বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। তাই গবেষকেরা অক্টোবরের একটি পূর্ণিমাকে বেছে নিয়েছিলেন। পরে গবেষণায় দেখা যায়, অমাবস্যাতেও ইলিশ প্রচুর ডিম ছাড়ে, যদিও পূর্ণিমার তুলনায় কিছুটা কম। এ সময় ইলিশের ডিমের পরিপক্বতা বেশি থাকে। পরিপক্ব ডিম থেকে জন্ম নেওয়া পোনার বেঁচে থাকার হারও বেশি।’

তিনি বলেন, ‘গবেষণা অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরুতে অমাবস্যা বা পূর্ণিমার মধ্যে যেটি আগে আসে, তার দুই দিন আগে থেকে একটানা ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। জেলেদের আহরণের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই ইলিশের প্রাচুর্য ধরে রাখতে একটি অমাবস্যা ও একটি পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।’

ড. আনিছুর রহমান বলেন, ‘জমিতে বীজ বপন না করলে যেমন ফসল পাওয়া যায় না, তেমনি ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ না দিলে পোনা জন্মাবে না, ভবিষ্যতে ইলিশও পাওয়া যাবে না। তবে গত কয়েক বছরে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে কিছু সমস্যা হয়েছে। ইলিশ আহরণ কমার পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে। সেসব সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।’

কমেছে উৎপাদন

মৎস্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের মোট উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে উৎপাদন হয়েছিল ৭১ হাজার ১ মেট্রিক টন এবং সামুদ্রিক জলাশয়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৩৭ মেট্রিক টন। পরবর্তী দুই দশকে বিভিন্ন বছর উৎপাদন ১ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশের মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে ২ লাখ ৭১ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন এবং সামুদ্রিক জলাশয়ে ৩ লাখ ১২ মেট্রিক টন।

চাঁদপুরের ইলিশের চাহিদা ব্যাপক

তবে উৎপাদন বৃদ্ধির এই ধারায় ছেদ পড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে ইলিশের উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ মেট্রিক টনে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে ৫ লাখ মেট্রিক টনে নেমেছে।

কমার কারণ যা বলছেন গবেষকরা

ইলিশ গবেষকরা বলছেন, নদীদূষণ, চর ও ডুবোচরের পরিবর্তন, শত শত ড্রেজারের মাধ্যমে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার মতো কারণে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে শুধু নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইলিশের বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র রক্ষায়ও গুরুত্ব দিতে হবে।