জানা যায়, নতুন মডেলের মোটরসাইকেল কিনে না দেওয়ায় ফরিদপুরে বাবার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া ফারদিন হুদা মুগ্ধ নেশাসক্ত, একগুঁয়ে ও জেদী ছিল। একমাত্র ছেলে হওয়ায় সে তার আবদার পূরণ করাতে বাবা-মায়ের সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করতো। নিজের ভালোটা বুঝতে সে স্বার্থপরের মতো আচরণ করতেও দ্বিধা করেনি। বুধবার তার বাবা এটিএম রফিকুল হুদার (৪৮) মৃত্যুর পর মুগ্ধের আচরণ ও এ ঘটনার কারণ নিয়ে জানা গেছে এমন বিভিন্ন তথ্য।
পরিবার সূত্রসহ এলাকাবাসী জানিয়েছে, বাবা-মায়ের অতিরিক্ত আদর পেয়েই বখে যায় মুগ্ধ। বাবা তার সব দাবি পূরণ করার কারণে নতুন মডেলের মোটরবাইকের প্রতি আসক্তি তৈরি হয় তার। আর এটি না পেয়েই বাবার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো দুঃসাহস দেখায় সে। এছাড়াও কথায় কথায় বাবার কাছ থেকে টাকা পাওয়ার কারণে নেশাসক্তও হয়ে পড়ে এই কিশোর।
জানা যায়, মুগ্ধ এ বছর ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। এরপর থেকেই সে তার বাবার কাছে নতুন মডেলের একটি মোটরসাইকেল দাবি করে। অথচ মুগ্ধের বর্তমান ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিরই বাজার মূল্য প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।
হুদার পরিবারের কারো দেখা পাননি সৈয়দ গোলাম আম্বিয়া। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘ওদের অনেক সম্পত্তি ছিল। অনেক ধনী ছিল ওরা। একই সঙ্গে ছিল ফরিদপুর শহরের নামকরা মানুষ। তাদের ছেলে এমন হয়ে গেল-এটা খুব দুঃখজনক। ছেলেটা নষ্ট বা দুষ্টু যেটাই বলেন তাই হয়েছিল। তবে ছেলের কথা কখনই কিছু বলেনি ওরা।’
পুলিশের এই উপ-পরিদর্শক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছেলেটা বখে গিয়েছিল, খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পরেছিল এবং নেশাগ্রস্ত ছিল বলে শুনতে পেয়েছি। আর ঘটনার সময় সে প্রকৃতস্থ ছিল না, সুস্থ ছিল না। আর এর চরম মাশুল দিয়ে গেল আমার বন্ধু।’
মুগ্ধর পারিবারিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে রমনা জোনের তিনি বলেন,‘পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একটা গ্যাপ থাকলেও থাকতে পারে, আমি জানি না।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত রোজার মাসে রাতের দিকে মুগ্ধ ফরিদপুর শহরের তেঁতুলতলার মোড়ে এক দোকানের চাল খুলে টাকা ও জিনিসপত্র চুরি করে ধরা পরে। কিন্তু ওই সময়ে তার অভিভাবকরা যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন দোকানদার মো. রিমন।
ফরিদপুরের কমলাপুর এলাকার ব্যবসায়ী মো.আসলাম মোল্লা জানান, অভিভাবকরা সন্তানকে যথাযথ শাসন না করা এবং অন্যায় আবদার রাখার পরিণতিতেই আজ মুগ্ধর বাবা পিন্টুকে জীবন দিতে হলো।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদার ছোট ভাই এটিএম রফিকুল হুদা পিন্টুর মরদেহের সুরতহাল বিকাল সাড়ে চারটার দিকে সম্পন্ন হয় ও পরিবার সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করেন শাহবাগ থানার সাব ইন্সপেক্টর মাজহারুল ইসলাম। এরপর তা নিহতের বড় ভাই বড় ভাই এটিএম সিরাজুল হুদা, ভগ্নিপতি গোলাম মোস্তফা ও ভাগ্নে ইফতেখার আলমের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর সন্ধ্যায় রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
এ ঘটনায় মুগ্ধকে একমাত্র আসামি করে বুধবার রাতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন নিহতের ভগ্নিপতি আকরাম উদ্দিন।
প্রসঙ্গত, নতুন মডেলের মোটরসাইকেল না পেয়ে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ফরিদপুর শহরে নিজের মা-বাবার শরীরে আগুন দেয় তাদের একমাত্র ছেলে মুগ্ধ। এতে রফিকুল হুদা গুরুতর দগ্ধ হন আর তার স্ত্রী সিলভিয়া হুদা ও তাদের ছেলে মুগ্ধু সামান্য দগ্ধ হয়। এলাকাবাসী তাদের উদ্ধার করে প্রথমে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে রফিকুলের অবস্থার অবনতি হওয়ায় গত শুক্রবার তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের স্থানান্তর করা হয়। আর সিলভিয়া হুদা ও তার ছেলেকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। শরীরের ৬০ শতাংশ পুড়ে যাওয়ায় টানা ৭ দিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন থাকার পর আজ বুধবার সকালে মৃত্যু হয় তার।
বাবার সঙ্গে এ হঠকারিতার আগে ১৩ সেপ্টেম্বর ঈদের দিন রাতে মুগ্ধ ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখে, ‘পৃথিবীতে নিজে ভালো থাকতে হলে স্বার্থপর হতে হবে। আর অন্যকে ভাল রাখতে গেলে নিঃস্বার্থ হতে হবে এটাই সত্য।’
/এআর/টিএন/এইচকে/আপ-এনএস/