চাষাঢ়া বোমা হামলা মামলারও আসামি মুফতি হান্নান!

মুফতি হান্নাননারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে বোমা হামলা মামলার বিচার শেষ হওয়ার আগেই ফাঁসিতে ঝুলতে হচ্ছে ওই মামলার প্রধান আসামি জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানকে। ইতোমধ্যে তার স্বজনেরা ঢাকার কাশিমপুর কারাগারে দেখা করেছেন। ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর বোমা হামলার মামলায় এ জঙ্গি নেতার ফাঁসি হলেও চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বোমা হামলা মামলায় তার কী সাজা হতো সেটা জানতে না পারায় আক্ষেপ ওই ঘটনায় আহতদের।

আলোচিত চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় ২০ জনের নিহতের বিচার হয়নি ১৬ বছরেও। যদিও নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার বিচার কাজ শেষ হয়েছে মাত্র পৌনে ৩ বছরে। মাত্র ৩৮টি কার্য দিবসেই শেষ হয় সাক্ষ্য গ্রহণ, যুক্তিতর্কসহ বিচারিক আনুসাঙ্গিক কাজ। সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেনকেও ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় দেড় বছরের মাথায়। আর ২০ হত্যার অন্যতম দুই আসামিকে বছরের পর বছর ধরে আনা সম্ভব হয়নি ভারতের কারাগার থেকে। 

চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলা

২০০১ সালের ১৬ জুন শহরের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে দেশের অন্যতম নৃশংস বোমা হামলার ঘটনায় মারা যান ২০ জন। সেদিন আহত হয়েছিলেন ওই সময়ের ও বর্তমান এমপি শামীম ওসমানসহ অর্ধ-শতাধিক, তাদের অনেকেই এখন পঙ্গুত্বের জীবন কাটাচ্ছেন।

বোমা হামলার পরের দিন বর্তমানে মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি খোকন সাহা বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় দুটি মামলা দায়ের করেন। এর মধ্যে একটি বিস্ফোরক আইনে ও অন্যটি হত্যা মামলা। জেলা বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক (বর্তমানে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা) অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারকে প্রধান করে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের মোট ২৭ জনকে আসামি করা হয়।

ঘটনার প্রায় ২২ মাস পর ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে বোমা হামলার দুই মামলার ফাইনাল রিপোর্টে বলা হয়, ‘উল্লেখিত ২৭ জনের কেউই চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে ১৬ জুন ২০০১ সালের বোমা হামলায় জড়িত নয়।’ প্রায় ছয় বছর মামলাটি হিমাগারে থাকার পর সিআইডির আবেদনে ২০০৯ সালের ২ জুন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে মামলাটি নিষ্পত্তি করার জন্য সরকারকে আদেশ দেন।

ঘটনার দীর্ঘ ১২ বছর পর দু’টি মামলায় ২০১৩ সালের ২ মে ৬ জনকে অভিযুক্ত ও ৩১ জনকে অব্যাহতি প্রদান করে দু’টি মামলার প্রত্যেকটির ৯৪৭ পাতার চার্জশিট দাখিল করা হয়। চার্জশিটে অভিযুক্ত ৬জন হলেন নারায়ণগঞ্জে ক্রসফায়ারে নিহত যুবদল ক্যাডার মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভোট ভাই শাহাদাতউল্লাহ জুয়েল, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান, ওবায়দুল্লাহ রহমান, ভারতের দিল্লি কারাগারে আটক সহোদর আনিসুল মোরসালিন, মুহিবুল মুত্তাকিন এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু যিনি একই সঙ্গে মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। অভিযুক্তদের মধ্যে জামিনে থাকা কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু ও ওবায়দুল্লাহ রহমান ছাড়া অন্যরা গ্রেফতার রয়েছে।
২০০৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের রাজধারী দিল্লির এক রেলস্টেশন থেকে হরকাতুল জিহাদের দুই জঙ্গি সহোদর আনিসুল মোরসালিন ও মুহিবুল মুত্তাকিনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বাড়ি বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায়। তারাও বোমা হামলার ঘটনা স্বীকার করেছেন। বর্তমানে তারা দিল্লি কারাগারে বন্দি।  কিন্তু তাদের এখনও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর গ্রেফতার হয় হরকাতুল জেহাদের অন্যতম নেতা মুফতি আবদুল হান্নান। গ্রেফতারের পর সে র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে চাষাঢ়া বোমা হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। 

বিলম্বের কারণও মুফতি হান্নান ইস্যু

নারায়ণগঞ্জ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওয়াজেদ আলী খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ১৬ জুনের বোমা হামলার ঘটনার প্রধান আসামি হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের বিরুদ্ধে সারাদেশে ৫১টি মামলা থাকায় যথা সময়ে তাকে নারায়ণগঞ্জ হাজির করা যায়নি। এ কারণেই মামলায় দীর্ঘসূত্রিতা হয়েছে।

মামলার বাদী মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি খোকন সাহা জানান, ‘আমরাও চাই মামলাটির দ্রুত নিস্পত্তি হোক। জটিলতা এড়িয়ে যাতে দ্রুত কাজ শেষ হয় সে দাবি আমাদের।’

১৬ জুন বোমা হামলায় দুই পা হারানো মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি চন্দন শীল জানান, ‘মুফতি হান্নানের ফাঁসির আদেশ হলেও আমি তত খুশি হতে পারিনি। আমি আরও বেশি খুশি হতাম যদি আমাদের ১৬ জুন বোমা হামলা মামলায় তার সাজা হতো। তার পরেও বিচার তার নিজস্ব গতিতে চলছে।’

/এফএস/ 

আরও পড়ুন- 

আল্লাহ তাকে ভালো রেখেছে, সে সুস্থ আছে: মুফতি হান্নানের স্ত্রী

‘জঙ্গি রিপনের ফাঁসি কার্যকরে প্রস্তুত ১০ জল্লাদ’