রাজবাড়ী জেলার দৌলতদিয়ায় পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং প্রচণ্ড স্রোতের কারণে ফেরিগুলোকে ধীর গতিতে চলছে। এছাড়াও ঘাটের র্যাম বেজের মাটি ও পল্টুন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ফেরিগুলো পাড়ে ভিড়তে অতিরিক্ত সময় লাগছে। যে কারণে দৌলতদিয়ায় ফেরি ঘাটে গিয়ে দেখা যায়,যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। তার মধ্যে অগ্রাধিকার পাচ্ছে যাত্রীবাহী বাস ও কাঁচামালবাহী ট্রাক। তাই অন্য ট্রাকগুলোকে ফেরি পারের জন্য দুই থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দৌলতদিয়া পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদ সীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাশাপাশি দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরির সংখ্যা তুলনামূলক কম। যে কারণে ঢাকামুখি যানবাহন পারাপারে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুন সময় লাগছে। গত রোজার ঈদের সময় যেখানে ৩০ মিনিটে নদী পার হওয়া যেতো এখন সেখানে ১ ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে।
ফেরি পারের জন্য দৌলতদিয়া ঘাটে আসা যাত্রীবাহি বাসগুলোকে কয়েক ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। এর ফলে চরম ভোগান্তিতে পরে ঢাকামুখি যাত্রীরা। অন্যদিকে ফেরি পারের জন্য পণ্যবাহি ট্রাকগুলোকে বেশ কয়েক দিন দৌলতদিয়া ঘাটে আটকে থাকতে হয়। যে কারণে নষ্ট হচ্ছে ট্রাকে থাকা কাঁচামালসহ পচনশীল দ্রব্য। এছাড়া চরম ভোগান্তিতে আছে মালবাহি ট্রাকচালক ও হেলপাররা।
সরেজমিন দৌলতদিয়া ঘাট এলাকা ঘুরে প্রায় তিন শতাধিক ট্রাকচালকের ভোগান্তির এ চিত্র দেখা যায়। কেউ ট্রাকের মধ্যে ঘুমাচ্ছেন। অনেকে গল্প-গুজব করে সময় পার করছে। কেউ আবার ব্যস্ত রয়েছেন দালাল ধরে ঘাট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করার জন্য।
সাতক্ষীরা থেকে ঢাকার মোহাম্মদপুরগামী ট্রাকচালক (ঢাকা মেট্টো ট ১১-৯৭৬৫) রাজু আহম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘পাঁচদিন আগে সাতক্ষীরা জেলার ভোমরা পোর্ট থেকে ট্রাকে করে চাল নিয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারিনি। একদিন গাড়ি নিয়ে আটকে ছিলাম গোয়ালন্দ মোড় এলাকায়। সেখানে হাইওয়ে পুলিশকে দুই শ’ টাকা ঘুষ দিয়ে ছাড়িয়ে এনেছি। এরপর দৌলতদিয়া ঘাটে এসে চারদিন ধরে ফেরিতে উঠার অপেক্ষায় রয়েছি। কাছে থাকা টাকাও প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন কি করবো বুঝতে পারছি না।’
রাজুর সঙ্গে আলাপকালে প্রায় অর্ধশত ট্রাকচালক সেখানে এসে তাদের ভোগান্তির কথা বলতে থাকেন। সবারই রাজুর মতো একই অবস্থা। কেউ দুই দিন, কেউ চারদিন, কেউবা পাঁচদিন ধরে ফেরিতে ওঠার জন্য সিরিয়ালে আটকে রয়েছেন। কখন যে ফেরির দেখা মিলবে তা কারও জানা নেই।
লোহার রড বোঝাই ট্রাকচালক মোহাম্মদ আলী জানায়, ‘চারদিন দৌলতদিয়া ঘাটে আটকে থাকার পর অবশেষে ফেরিতে ওঠার সুযোগ পেলাম। অনেক ট্রাকচালক পুলিশ ও দালালদের টাকা দিয়ে সিরিয়াল ভেঙে ফেরিতে উঠে। তখন অনেক কষ্ট লাগে। কিন্তু-কিছুই করার নাই।’
ফেরিতে ওঠা চানাচুর বোঝাই সিলেটগামী ট্রাকচালক বাবু সেখে বলেন, ‘ফরিদপুরের কানাইপুর থেকে গাড়িতে চানাচুর লোড করে রোববার (১৬ জুলাই) রাত ১০টার দিকে দৌলতদিয়া ঘাটে এসে সিরিয়ালের জন্য আটকে যাই। সকালে এক পুলিশ কর্মকর্তা কে ১৫শ’ টাকা ও দালালদের ৪শ’ টাকা বকশিশ দিলে তারা সিরিয়াল ভেঙে ফেরিতে ওঠার সুযোগ করে দেয়।’
এদিকে, সিরিয়ালে আটকে থাকা বেশিরভাগ ট্রাকচালকরা অভিযোগ করে বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ বলে দৌলতদিয়া পাটুরিয়া নৌরুটে ১৬/১৭টি ফেরি চলাচল করছে। কিন্তু বাস্তবে ফেরি ৭/৮ টি ফেরি চলাচল করে। ১৬/১৭ টি ফেরি চলাচল করলে যানবাহনের এমন লাইন হওয়ার কথা না।’
ট্রাকচালকরা দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরির সংখ্যা বাড়িয়ে গাড়ি চালক ও যাত্রীদের ভোগান্তি কমানোর জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান।
চালকদের সব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বিআইডব্লিউটিসি’র দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মো. শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, প্রচণ্ড স্রোতের কারণে ফেরি পারাপারে সময় বেশি লাগছে। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ১৭টি ফেরি চলাচল করছে। চারটি ফেরিঘাটই সচল রয়েছে। তবে চার নম্বর ঘাটটি হুমকিতে রয়েছে। সিরিয়াল অনুযায়ী সুষ্ঠুভাবে ফেরিতে গাড়ি পার করা হচ্ছে।
দৌলতদিয়া ঘাটে কর্তব্যরত সার্জেন্ট এস এম পারভেজ সোহান জানান, ঘাটে শৃঙ্খলা ও সিরিয়াল অনুযায়ী যানবাহন পার করা হচ্ছে। এ জন্য পুলিশ সদস্যরা দিন রাত কাজ করছে। যাত্রীবাহি বাস ও পচনশীল পণ্যবাহি ট্রাক সিরিয়াল মোতাবেক আগে ও অপচনশীল পণ্যবাহি ট্রাক একটু পরে ফেরিতে উঠানো হচ্ছে। তবে ফেরি লোড আনলোড করায় সময় লাগে। যে কারণে ঘাটে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন হচ্ছে।
/জেবি/
আরও পড়তে পারেন : মানিকগঞ্জে নৌকার মাঝি হত্যা মামলায় ৩ জনের ফাঁসি