পুকুরের ওপর ২০০ প্রতিমা, উপচে পড়া ভিড় দর্শনার্থীদের

পুকুরের ওপরে নির্মিত রাজা দশরত এর প্রাসাদ প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের সবচেয়ে বড় ও ব্যতিক্রমী দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর গ্রামে। সেখানে পুকুরের ওপর বাঁশ ও কাঠ দিয়ে নির্মিত মণ্ডপে চলছে সনাতন ধর্মের রামায়ণ, মহাভারত, শিবপুরান ও পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে দেবদেবীর ২০০টি প্রতিমার প্রদর্শনী। দর্শনার্থীদের কথা চিন্তা করে লক্ষ্মীপূজা পর্যন্ত এ প্রদর্শনী রাখবে আয়োজকরা।

জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের আলোকদিয়া গ্রামে গোবিন্দ বিশ্বাসের বাড়িতে চলছে ব্যতিক্রমী এ আয়োজন। জেলার গন্ডি পেরিয়ে এই আয়োজনের কথা ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। প্রতিদিন কয়েক হাজার দর্শনার্থী ছুটে আসছেন বালিয়াকান্দিতে।

দর্শনার্থীর ভিড় মণ্ডপে প্রবেশের সময়ই পুকুরের ওপরে বিশাল আকৃতির রাজা দশরত এর প্রাসাদ। সেখানে ঢুকতেই লম্বা লাইন। সিরিয়াল অনুযায়ী ভেতরে ঢুকতেই দর্শনার্থীরা মুগ্ধ।

প্রথম মণ্ডপে দেখা মেলে রামায়ণের কাহিনী। রাজা দশরত, রাম, লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, বৈশিষ্ট মনি, রাজার তিন রানী কৈশলা, সুমিত্রা, বাল্মিকী মনি, লককুশসহ রামায়ণের বিভিন্ন চরিত্রের রূপ।

এরপর দ্বিতীয় মণ্ডপে শিবপুরান, শিব থেকে ঘোড় দৈত্য, ঘোড় দৈত্য মহামায়ার রুপ ধারণ করে মহামায়ার প্রতি কুনজরে তাকানো, মহামায়া কালিরূপ ধারণ করে ঘোড় দৈত্যকে বধ করার দৃশ্য।

দেব-দেবীর প্রতিমাতৃতীয় মণ্ডপে দর্শনার্থীরা দেখতে পাবেন, শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম, গুরুগৃহে অস্ত্র শিক্ষার জন্য গেল। গুরুর কাছে অস্ত্র শিক্ষা গ্রহণ করে তাকে দক্ষিণা দিতে যায়। গুরু দক্ষিণা না নিয়ে শ্রী কৃষ্ণের কাছে দক্ষিণা হিসেবে বহুদিন আগে তার পুত্র সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে হারিয়ে গেছে সেই ছেলেকে ফেরত চায়, গুরুর আদেশে শ্রী কৃষ্ণ তার দক্ষিণা ফেরত দিতে সমুদ্র দেবের কাছে যায়। সমুদ্র দেব বললো সে আমার কাছে নেই, সে আছে শঙ্ক রাজের কাছে, শঙ্ক রাজের সঙ্গে শ্রী কৃষ্ণের যুদ্ধ। যুদ্ধ শেষে সে বললো তার গুরু ভ্রাতা আছে জমালয়ে, সেখানে যমরাজের সঙ্গে যুদ্ধ, যুদ্ধ করে যমরাজের কাছ থেকে বিষ্ণুরুপ ধারণ করে গুরু ভ্রাতাকে উদ্ধার করা। সেই গুরু ভ্রাতাকে নিয়ে পুনরায় গুরুগৃহে গিয়ে ফেরত দিয়ে গুরুর আশির্বাদ নিলো।

চতুর্থ মণ্ডপে প্রবেশ করতেই দেখা যাবে, ঘোড় দৈত্য বধ, ঘোড় দৈত্যের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ, শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে মহাদেবের যুদ্ধ, সেখানে বিষ্ণু, নারায়ণী নারদ সকলেই ঘোড় দৈত্যের উদ্ধারের জন্য মহাদেবকে ঘুম পাড়িয়ে ঘোড় দৈত্যকে উদ্ধার করে। পাতালপুরে মহিরাবন বধ, কুরুক্ষেত্রে অভিমন্যু বধ, সেখানে চক্র গুহ আছে। সেই চক্র গুহ একটা পদ্মে ব্রহ্মা,বিষ্ণু,শিব বসে আছেন জলের মধ্যে। শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা। হিমালয় পর্বতে মহাদেব, আর মহাসমুদ্রে নারায়ণসহ প্রায় দুই শতাধিক দেবদেবীর প্রতিমা।

দেব-দেবীর প্রতিমামাগুরা জেলা থেকে আসা মৌতিশা রায় চৌধুরী জানান, তিনি স্বপরিবারে বালিয়াকান্দিতে এই ব্যতিক্রমী পূজা দেখতে এসেছেন। এমন আয়োজন তিনি এর আগে কোথাও দেখেননি।

যশোর থেকে আসা পুলক সাহা জানান, তিনি তার এক বন্ধুর কাছ থেকে শুনে এই মণ্ডপ দেখতে ছুটে এসেছেন। প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে অনেক কষ্টে তিনি মণ্ডপের ভেতরে প্রবেশ করেছেন।

রাজবাড়ী সদর থেকে বালিয়াকান্দির জামালপুরে ঘুরতে আসা টিটো কর্মকার জানান, তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে পূজা দেখতে এসেছেন। অন্যরকম অভিজ্ঞতা নিয়ে তারা বাড়ি ফিরছেন।

জামালপুর ও আলোকদিয়া সার্বজনীন শ্রী শ্রী শারদীয়া দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিধান কুমার ভট্টাচার্য্য জানান, জামালপুর ও আলোকদিয়া উত্তরপাড়া গ্রামে প্রায় ২০ বছর ধরে এ পূজা হচ্ছে। এবারের পূজায় সনাতন ধর্মের রামায়ণ, মহাভারত, শিবপুরান ও পৌরানিক কাহিনী অবলম্বনে দেব-দেবীর ২০০টি মূর্তি প্রদর্শন করা হচ্ছে।

দর্শনার্থীরাজামালপুর ও আলোকদিয়া উত্তরপাড়া সার্বজনীন শ্রী শ্রী শারদীয়া দুর্গা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গোবিন্দ কুমার বিশ্বাস জানান,ধর্মীয় কাহিনী অবলম্বনে এ পূজাটা হচ্ছে। দর্শনার্থীদের কথা ভেবে লক্ষ্মীপূজা পর্যন্ত এ প্রদর্শনী চলবে।

রাজবাড়ীর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মো. আছাদুজ্জামান জানান, জেলায় এবার চার শতাধিক মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিটি পূজা মণ্ডপে পর্যাপ্ত সংখ্যক নারী ও পুরুষ পুলিশ সদস্য, সাদা পোশাকধারী পুলিশ, গ্রাম পুলিশ এবং আনসার সদস্য মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে।

আরও পড়ুন:

আজ বিজয়া দশমী, বাজছে বিদায়ের সুর