ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঐতিহাসিক জিনজিরা প্রাসাদটি অবশেষে পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণের জন্য কার্যকরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ও কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কেরানীগঞ্জ জিনজিরা প্রাসাদের মুল ফটকের সামনে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কেরানীগঞ্জ রাজস্ব সার্কেল সহকারী কমিশনার (ভুমি) পারভেজুর রহমান।
ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করায় এলাকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও এলাকাবাসীসহ সচেতন নাগরিক সমাজ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনকে সাধুবাদ জানিয়েছে। তারা বহুদিন ধরে এ প্রাসাদটি রক্ষার জন্য সংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দফতরে জোড় দাবি জানিয়ে আসছিল। যুগ যুগ ধরে এই স্থাপনাটি অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ ভেঙে সেখানে দোকানপাট, বাড়িঘরসহ বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণ করে ভোগ দখল করে আসছিল।
একসময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এই জিনজিরা প্রাসাদটি দেখার জন্য এখানে এসে ভীড় জমাতো। অবহেলা ও অযত্নে মধ্যেও কয়েক’শ বছরের পুরনো এ প্রাসাদের শেষ চিহ্নটুকু এখনও মাথা উঁচু করে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জানা যায়, বাংলার মোগল সুবেদার দ্বিতীয় ইব্রাহিম ১৭ শতকের শেষার্ধে জিনজিরা প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। পুরান ঢাকার বড় কাটারা প্রাসাদ-দুর্গের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদীর দক্ষিণ প্রান্তের তীর ঘেষেই বড় কাটারার ক্ষুদ্র আদলে এই জিনজিরা প্রাসাদটি নির্মিত হয়। প্রাসাদটি মুলত নির্মিত হয়েছিল প্রমোদ কেন্দ্র হিসেবে। পরে সেখানে বাস করতেন মোগল সুবেদার মুর্শিদ কুলি খান। ১৭০৩ সালে তার রাজস্ব প্রশাসন দফতর মকসুদাবাদে স্থানান্তরের পূর্ব পর্যন্ত প্রাসাদটি তার আবাসস্থল ছিল। এরপর বিভিন্ন সময় ঢাকা সফরকালে তিনি এই প্রাসাদেই অবস্থান করতেন। নবাব আলীবর্দী খানের অধীনে ঢাকার নায়েব নাযিম নওয়াজিশ মুহাম্মদ খানের প্রতিনিধি হোসেন কুলি খানেরও পারিবারিক আবাসস্থল ছিল এই প্রাসাদ। বাংলার ইতিহাসের বহু বিয়োগান্তক ও বেদনাবিধুর বহু ঘটনার স্বাক্ষী এই প্রাসাদ। নবাব সরফরাজ খানের পতনের পর তার মা, স্ত্রী, বোন ও ছেলেমেয়েসহ তার হেরেমের কয়েকজন নারীকে এই প্রাসাদে বন্দী রাখা হয়। ১৭৫৪ সালে হোসেন কুলি খানকে হত্যার পর এই প্রাসাদে বসবাসরত তার পরিবারের সদস্যদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল এখানে।
পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর আলীবর্দী খানের স্ত্রী শরিফুন্নেসা, নবাব সিরাদ্দৌলার মা আমেনা বেগম, স্ত্রী লুতফুন্নেসা বেগম, মেয়ে কুদসিয়া বেগম ওরফে উম্মে জোহরাকেও এই প্রাসাদে বন্দি রাখা হয়। তাদের সঙ্গে বন্দি রাখা হয় পলাশী যুদ্ধের অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী ঘসেটি বেগমকেও। ১৭৬০ সালে নবাব সিরাজদ্দৌলার মা আমেনা বেগম ও ঘসেটি বেগমকে ধলেশ্বরী নদীতে নৌকা ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী জিনজিরা প্রাসাদ বর্তমানে নিশ্চিহ্ন প্রায়। এর আদি রূপ সম্পূর্নভাবে ধ্বংস হয়েছে। তবে এর একটি অংশ এখনো কালের সাক্ষী হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এ অংশের ভেতরে নানা কারুকাজের চিহ্ন এখনো দেখা যায়। দীর্ঘদিন অযত্নে অবহেলায় থাকায় প্রাসাদের বাহিরের অংশটি বিভিন্ন গাছের শিকর বাকর আষ্টে পৃষ্টে জড়িয়ে আছে। এছাড়াও এখানে নির্মাণ করা হয়েছে বড় বড় অট্রলিকা ও দোকানপাট। স্বাধীনতার পর থেকে এই অঞ্চলে মানুষের বসতি শুরু হয়। এলাকার মানুষ প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ ভেঙে সেখানে বাড়িঘর ও দোকান পাট নির্মাণ করে দখল করে ফেলছে। জিনজিরাবাসী এই প্রাসাদটিকে হাওলী নওগড়া নামে ডাকে।
এ ব্যাপারে আজ মঙ্গলবার (৩ জুলাই) কেরানীগঞ্জ রাজস্ব সার্কেল সহকারী কমিশনার (ভুমি) পারভেজুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান,প্রত্নতত্ব সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী প্রসাদটি পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণের জন্য সংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।