সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ব্যাংক কর্মকর্তা ছাড়াও শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আরশ্বাদ উল্লাহ, সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিনহাজ উদ্দিন এবং দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কলসানটেন্ট ডা. মঞ্জরুল হাসানকে ফোন করে চাঁদা দাবি করা হয় এবং হুমকি দেওয়া হয়। অপরদিকে, জেলা সিভিল সার্জন অফিসের হেড ক্লার্ক আওলাদ হোসেন ও ক্যাশিয়ার জয়নাল আবেদিনকেও ওই চক্রটি মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি ও জীবননাশের ভয় দেখায়। হুমকির কথা স্বীকার করেছেন এই কর্মকর্তারা। শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আরশ্বাদ উল্লাহ শিবালয় থানায় এব্যাপারে একটি জিডিও দায়ের করেছেন।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট ও সর্বহারা পার্টির নেতা হাতকাটা বিপ্লবের পরিচয়ে হরিরামপুর উপজেলার বয়রা অগ্রণী ব্যাংক শাখা ব্যবস্থাপক রাজিব মিয়াকে গত ২১ অক্টোবর বিকাল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে ব্যাংকের ব্যবহৃত মুঠোফোনে ০১৮৬২৮১৭৪৯৩ নম্বর থেকে ফোন করা হয়। ফোন রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে সর্বহারা পার্টির সদস্য পরিচয়ে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ওই ব্যাংক কর্মকর্তা ও তার পরিবারের সব সদস্যকে গুম ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা অন্য কাউকে না জানানোর কথাও বলা হয়।
পরে নিজের ও পরিবারের কথা চিন্ত করে হুমকি দাতার দেওয়া পৃথক নয়টি বিকাশ নাম্বার ও একটি রকেট নম্বরে এক লাখ ৪৫ হাজার টাকা পাঠান তিনি। পরে অবশ্য তিনি হরিরামপুর থানায় একটি সাধারণ ডাইরি করেন।
চক্রটির জীবননাশের ভয় পেয়ে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার অগ্রণী ব্যাংক আরিচা ঘাট শাখার অফিসার মো. শরিফুল ইসলাম এক লাখ ৭০ হাজার টাকা বিকাশে পেমেন্ট করেন। তিনি জানান, তার কাছে ০১৮৩৪৯৭৩০৫২ নম্বর থেকে ফোন দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। না দিলে জীবননাশের ভয়ও দেখানো হয়। বলুন কার না জীবনের মায়া আছে! বাধ্য হয়ে টাকাগুলো হুমকিদাতাদের দেওয়া বিকাশ নম্বরে পাঠিয়েছি। অবশ্য, এ ঘটনায় শরিফুল ইসলাম শিবালয় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
গত ২২ অক্টোবর হরিরামপুর উপজেলার অগ্রণী ব্যাংক ঝিটকা শাখা ব্যবস্থাপক মিহির কুমার প্রামানিক ও সিনিয়র অফিসার মকবুল হোসেনের মুঠোফোনে সর্বহারা নেতা হাতকাটা বিপ্লবের পরিচয় দিয়ে ০১৭৭৭৯২০৭৩৫ ও ০১৮৫৯১২৫৫০৭ নম্বার থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ব্যাংক ডাকাতি ও দুই কর্মকর্তাসহ তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অপহরণ করে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়া সিংগাইর উপজেলার অগ্রণী ব্যাংক মানিকনগর শাখার ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেনকে একই পরিচয়ে ০১৮১৯৪১২৯৫৬ নম্বার থেকে ফোন দিয়ে চাঁদা চাওয়া হয়।
এদিকে, গত ২৫ অক্টোবর বিকাল ৩টার দিকে সোনালী ব্যাংক সিংগাইর শাখা ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলামকেও ফোন দেয় চক্রটি। একই ফোন নম্বার থেকে ফোন দিয়ে ব্যাংকটির উপজেলার চান্দহর শাখা ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়া, সিংগাইর পূবালী ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক জসিমুদ্দিনের কাছেও একইভাবে ফোন দিয়ে চাঁদা দাবি করা হয়।
সিংগাইর অগ্রণী ব্যাংক শাখা ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম জানান, বিষয়টি উদ্বেগের। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
সাটুরিয়া উপজেলা অগ্রণী ব্যাংক শাখার সেকেন্ড অফিসার প্রশান্ত কুমার বসাক জানান, গত ২২ অক্টোবর দুপুরে ০১৭৭৭৯২০৭৩৫ নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনটি রিসিভ করার পরই সে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতির পরিচয় দেয়। পরিচয় দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে।
সাটুরিয়া অগ্রণী ব্যাংকের ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামান জুয়েল জানান, ওই প্রতারক চক্রটি আমাকেও ফোন করেছিল। কিন্তু আমি ফোন ধরিনি। তিনি বলেন, ‘এরা পূর্ব বাংলার সদস্য নয়। এরা কোনও চাঁদাবাজ চক্র হবে বলে ধারণা করছি। তবে আমরা ভয়ে ভয়ে কাজ করছি।’
মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি ও সর্বহারাদের নাম বলে বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক ও সেবামূলক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কাছে চাঁদা দাবি এবং তাদের জীবননাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি শুনেছেন। এসব ঘটনা নিছক চাঁদাবাজদের কাজ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে হরিরামপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) আমিনুর রহমান জানান, উপজেলার দুটি অগ্রণী ব্যাংক শাখার পক্ষ থেকে থানায় একটি চাঁদাবাজির মামলা ও একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। মোবাইল নম্বার ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে চাঁদাবাজদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এ ধরণের ঘটনার শিকার আর যেন কেউ না হন, সে ব্যাপারে ব্যাংক ও সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে।
সাটুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি বলতে কোনও পার্টি এ দেশে এখন নেই। তবে যেসব নম্বর থেকে চাঁদা চাওয়া হয়েছে ওই সব নম্বর খুঁজে দেখা হচ্ছে।’