নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে ‘চৈতি কম্পোজিট লিমিটেড’ নামে একটি শিল্প কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে ৩০টি গ্রামের প্রায় ৩৫ হাজার সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। ওই কারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য খোলা স্থানে, খালে ও বিলে ফেলায় পরিবেশের ক্ষতিসহ এলাকার কয়েক শ’ হেক্টর কৃষি ও আবাদী জমির ধানসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়ে পড়ছে।
এলাকাবাসী জানায়, পরিবেশ দূষণ রোধে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে এবং পরিবেশ অধিদফতরসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলে একাধিকবার আবেদন করে এর কোনও প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা জানায়, কারখানার দূষিত বর্জ্য খালে-বিলে ফেলার কারণে ৩০ গ্রামের মানুষ পুকুর ও নদীর পানি কোনও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করতে পারছে না। এই পানি ব্যবহারের কারণে চর্ম রোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শত শত মানুষ। কারখানার এর আগে এলাকাবাসী উপজেলা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল ও পরিবেশ অধিদফতরে লিখিত অভিযোগ করে। পরে ২০০৮ সালের মার্চ মাসে যৌথবাহিনী ও পরিবেশ অধিদফতর অভিযান চালিয়ে কারখানাটি বন্ধ করে দেয়। কিছু দিন বন্ধ থাকার পর কারখানার মালিক কারাখানার বর্জ্য খাল ও গ্রামবাসীর জমির ওপর না ফেলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কারখানাটি আবার চালু করে। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটি কয়েক দফা জরিমানাও করা হয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সোনারগাঁও পৌরসভার টিপুরদী এলাকার চৈতি গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান চৈতি কম্পেজিট লিমিটেড নামে শিল্প কারখানাটি ২০০৬ সাল থেকে উৎপাদন চালিয়ে আসছে। এ শিল্প কারখানার তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) যথাযথ ব্যবহার না করে উৎপাদিত সুতা তৈরি ও সুতা রং করার তরল বিষাক্ত বর্জ্য মারিখালি নদীর সংযোগ খালে ফেলছে। এ বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে পৌরসভার টিপরদী, রতনদী, বসুরবাগ, তাজপুর, গোয়ালদী, মল্লিকেরপাড়া, গৌরবর্দী, মোগড়াপাড়া ইউনিয়নের বাড়িমজলিস, বাড়ি চিনিস, মোগরপাড়া, দলদার, বিন্নিপাড়া, কাবিলগঞ্জ, লেবুছাড়া, ভাটিপাড়া, বড় সাদীপুর, ছোট সাদিপুর, বন্দেরা, ফুলবাড়িয়া, গোহাট্টা, সোনাখালী, ডহরপাড়া, যোলপাড়া, দমদমাসহ ৩০ গ্রামের প্রায় ৩৫ হাজার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।
সোনারগাঁও পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর লায়ন মোশারফ হোসেনে বলেন, ‘আমার বাড়ির সামনে ও পেছনের দিকে পাইপ দিয়ে কারখানার কালো ও দূষিত পানি ফেলা হচ্ছে। এই বর্জ্য মিশ্রিত দূষিত পানির দুর্গন্ধে বাড়িতে বসবাস করা যাচ্ছে না।,
টিপুরদী এলাকার আব্দুল খালেক বলেন,‘কারখানাটির গোপন নালা দিয়ে প্রতিনিয়ত বের হচ্ছে বিষাক্ত বর্জ্য। বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে পরিবেশসহ আমাদের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। দুর্গন্ধের কারণে এ এলাকার মানুষকে মুখে কাপড় বেঁধে চলাচল করতে হয়।’
সোনারগাঁও পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মোতালেব মিয়া বলেন, ‘কারখানার বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলে পরিবেশের মারাক্তক ক্ষতি হচ্ছে।’
সোনারগাঁও পৌরসভার মেয়র মো. সাদেকুর রহমান বলেন,‘চৈতি কম্পোজিটের বর্জ্য খোলা জমিতে ফেলা হচ্ছে বলে সত্যতা রয়েছে। বর্জ্য পার্শ্ববতী খালে নিষ্কাশন করায় এলাকাবাসী বিভিন্ন ধরণের রোগ-বালাইয়ে ভুগছেন। তাদের বর্জ্য নিষ্কাশনের বিষয়ে পৌরসভার পক্ষ থেকে কয়েকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারপরও তারা কোনও ধরণের পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’
এ ব্যাপারে চৈতি কম্পোজিটের উপ-ব্যবস্থাপক বদরুল আলম বলেন,‘আমরা আমাদের ইটিপি প্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে পানি পরিশোধন করে ওই পানি আমাদের নিজস্ব জমিতে ফেলছি। আমরা কারখানার পানি এখন আর খালে নিষ্কাশন করছি না। বরং মাটির রং কালো হওয়ায় পানি রঙিন দেখা যাচ্ছে।
চৈতি কম্পোজিটের উপ-ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) মিজানুর রহমান বলেন,‘ আমরা শতভাগ পরিবেশ আইন মেনে পানি পরিশোধন করছি। তারপর পানি নিষ্কাশন করছি। এ পানিতে কোনও ধরণের ক্ষতিকারক দ্রব্য নেই।’
সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন,‘এ কারখানার দুষিত বর্জ্যের কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হোক এটা কেহ চাইবে না। তারা ইটিপি প্লানের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন করছে বলে আমি জানি। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. নয়ন মিয়া বলেন,‘ইটিপি ব্যবহার না করে সরাসরি বর্জ্য মিশ্রিত পানি খালে ছাড়ার অভিযোগে বেশ কয়েকদফা অভিযান চালিয়ে মোটা অংকের টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আবার অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’