দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মামলায় ‘ভুল’ আসামি হয়ে তিন বছর জেলে থাকার পর রবিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে কাশিমপুর কারাগার-২ থেকে ছাড়া পান জুটমিল শ্রমিক জাহালম। এরপর সরাসরি টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ধুবড়িয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে চলে যান তিনি। তিন বছর পর জাহালমকে দেখে পরিবারের সদস্যরা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। আবেগাপ্লুত জাহালম পরম মমতায় কোলে নিতে যান নিজের একমাত্র ৬ বছর বয়সী শিশুকন্যা চাঁদনীকে। কিন্তু বাবাকে চিনতে না পেরে তার কোলে যেতে চায়নি মেয়ে। পরে সবাই মিলে বারবার বাবাকে মেয়ের কাছে পরিচয় করিয়ে দেন।
এ ব্যাপারে জাহালমের স্ত্রী কল্পনা আক্তার বলেন,‘মেয়েটির বয়স যখন ৩ বছর,তখন চাঁদনী তার বাবাকে চিনতো। কিন্তু গত তিন বছর সে (জাহালম)জেলে থাকায় প্রথমে চাঁদনী তার বাবাকে চেনেনি। কাছেও যেতে চায়নি। বারবার বলার পর এখন মেয়েটি তার বাবার কাছে যাচ্ছে। বারবার তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে ইনিই তার বাবা। ’
জাহালম বলেন,‘দুদকের ভুলের কারণে ৩ বছর আমি কারাবন্দি ছিলাম। স্ত্রী-সন্তানের কাছে ছিলাম না। এখন ওদের কাছে পেয়ে খুবই ভালো লাগছে।’
জাহালমের অবর্তমানে গত বিন বছর সংসার চালানোর ব্যাপারে তার স্ত্রী কল্পনা বলেন, ‘জাহালম গ্রেফতার হওয়ার ছয় মাস পর শিশুকন্যা চাঁদনীকে তার নানির কাছে রেখে নরসিংদীর প্রাণ কোম্পানিতে ৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেই। ওই টাকায় সংসার চালিয়ে এক-দেড়মাস পর পর ৫শ’ টাকা জাহালমের জন্য জেলখানায় পাঠাতাম।’
স্বামীকে মিথ্যা মামলা থেকে মুক্ত করতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন কল্পনা। তিনি জানান, ‘গত তিন বছরে মামলা চালাতে বিভিন্ন এনজিও ও স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করেছি। এখন ১০টা এনজিওর কিস্তি চালাতে হচ্ছে। ঋণ পরিশোধ করতে ভিটেবাড়ির দশ শতাংশ জায়গা বিক্রি ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।’
ছেলেকে ফিরে পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন জাহালমের বৃদ্ধা মা মনোয়ারা বেগম। ছেলের চাকরি ফিরে পাওয়া ও মামলা চালাতে ঋণ হওয়ার টাকাগুলো পরিশোধ করতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবু সালেক নামে এক ব্যক্তির নামে ৩৩টি মামলা দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আসামি আবু সালেক কিন্তু তার বাড়ির ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল জাহালমের ঠিকানা। পরে সেই অর্থ আত্মসাতের মামলায় ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় দুদকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে জাহালমের বাড়ির ঠিকানায় চিঠি দেয় দুদক। জাহালম সেসময় নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। নির্দিষ্ট দিনে দুদকে হাজিরা দিয়ে জাহালম আবার তার নরসিংদীতে জুটমিলের কর্মস্থলে চলে যান। এর দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশালের ওই জুট মিল থেকে জাহালমকে গ্রেফতার করে নাগরপুর থানায় আনা হয়। পরদিন তাকে টাঙ্গাইলের আদালতে তোলা হলে জেলখানায় পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। ৭ দিন টাঙ্গাইল কারাগারে রাখার পর তাকে কাশিমপুর-২ কারাগারে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তিন বছর সেখানে কারাবন্দি ছিলেন জাহালম। সম্প্রতি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ভুল মামলায় তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি নজরে আসায় রবিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) হাইকোর্ট তাকে মুক্তির নির্দেশ দেন। পরে রবিবার মধ্যরাতে তাকে মুক্তি দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। মুক্তি পেয়ে টাঙ্গাইলের নিজের বাড়িতে চলে যান জাহালম।
আরও খবর:
অব্যাহতি পেলেন ২৬ মামলার ‘ভুল’ আসামি জাহালম