প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার অপেক্ষায় বঙ্গবন্ধু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীরা

আন্দোলনকারীরাগোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির অপসারণ দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। ভিসি প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগে ১৯ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। সেই হিসাবে তাদের আন্দোলনের আজ দশম দিন। এই আন্দোলন করে তারা কতটুকু সফল? এমন প্রশ্নও উঠেছে।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, তারা অনেকটা সফল হয়েছেন। ভিসির সঙ্গে যারা ছিলেন, তারা এখন আর তার পক্ষে কথা বলেন না। ইতোমধ্যে তিন জন সহকারী প্রক্টর তাদের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। অন্য শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। তারা আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনকে সফল করতে এই ভিসিকে অপসারণের ব্যবস্থা করবেন। তারা  মূলত এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার দিকে চেয়ে আছেন।

আন্দোলনকারীরা আরও জানান, আজ আন্দোলনের ১০ম দিনে তারা কেক কেটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৩তম জন্মদিন পালন করেছেন। পাশাপাশি ভিসির অপসারণের একদফা দাবির আন্দোলনও তারা অব্যাহত রেখেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য পদত্যাগকারী সহকারী প্রক্টর হুমায়ুন কবীর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে অনেকটা সফল দাবি  করে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলন একটা যৌক্তিক আন্দোলন। আমি আশা করি, প্রধানমন্ত্রী দেশে এসে দুর্নীতিবাজ ভিসিকে অপসারণ করবেন। আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কাজ সেই কাজ আগে করা সম্ভব হয়নি। এই ভিসির অপসারণের পর অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে।’

গোপালগঞ্জ সুজনের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ অধিকারী জানিয়েছেন, ছাত্ররা আন্দোলনে অনেকটা সফল হয়েছে। এখন শুধু ফলের অপেক্ষা। ইতোমধ্যে ইউজিসি তদন্ত করেছে। এসব ঘটনায় দেশের বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকজন তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি এটিকে একটি সফল আন্দোলন হিসেবেই দেখছেন।

উল্লেখ্য, এই আন্দোলনের আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল। বিশেষ করে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ নিয়ে এবং ইইই বিভাগের প্রধান এসএম আক্কাস আলীর নারী কেলেঙ্কারিকে সমর্থন করাসহ অফিসের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দ্বিতীয়বারের মতো ভিসি পদে নিয়োগ পান। তিনি কথায় কথায় শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের আদেশ দিতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন সময় বহিষ্কারের আদেশ দিয়েছেন বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। অশালীন ভাষায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতেন। যার অডিও রেকর্ড  ইতোপূর্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। কিন্তু, ভিসি সবকিছুকে ড্যাম কেয়ার করে স্বৈরাচারী কায়দায় বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে চেয়েছেন এবং চালিয়েছেন। একপর্যায়ে ফেসবুকে একটি মন্তব্য করায় আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ও সাংবাদিক ফাতেমাতুজ-জিনিয়াকে ১১ সেপ্টেম্বর বহিষ্কারের আদেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ  বাড়তে থাকে। পরে এটি আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে জিনিয়ার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু, আন্দোলন আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অনশন ও অবস্থান নিয়ে ভিসির পদত্যাগের এক দফা আন্দোলনের লাগাতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন।

অভিযোগ রয়েছে, ২১ সেপ্টেম্বর শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আন্দোলনে যোগ দিতে আসা শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন সংযোগ সড়কে বহিরাগতরা হামলা চালায়। এসময় অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। ওই দিন কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা ও সকাল ১০টার মধ্যে হল ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দেয়। কিন্তু, শিক্ষার্থীরা তা অমান্য করে আন্দোলনে যোগ দেন। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তাদের দায় সারে। ড. আব্দুর রহিমকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি গত বৃহস্পতিবার তাদের তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তাতে তারা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার  জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করেছে। কিন্তু, এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ আইনগত ব্যবস্থা নেননি।

ভিসি প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিনের অপসারণের দাবিতে ইতোপূর্বে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ভিসিকে লাল কার্ড প্রদর্শন, কুশপুত্তলিকা দাহ, ঝাড়ু মিছিল, মশাল মিছিল, মোমবাতি মিছিল, বিক্ষোভ মিছিল, একাধিকবার প্রেস ব্রিফিং, মানববন্ধন প্রভৃতি নানা কর্মসূচি পালন করেন।

এ ঘটনায় ইউজিসির ড. মো. আলমগীরকে প্রধান করে গঠিত ৫ সদস্যের একটি তদন্ত দল ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। আহত শিক্ষার্থী, আন্দোলনরত অন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ভিসির কথা শুনেছেন এবং তাদের লিখিত বক্তব্যের রেকর্ড নিয়ে গেছেন।