‘আর কয় রাত নিজের বাড়িতে ঘুমাতে পারবো জানি না। এ বাড়িটি কালিগঙ্গা কেড়ে নিলে পায়ের নিচের মাটি টুকুও আর থাকবে না।’ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন মানিকগঞ্জ পৌরসভার নবগ্রাম ইউনিয়নের বেংরুই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল। আব্দুল জলিল এক সময় খাদ্য গুদামের দারোয়ান হিসেবে চাকরি করতেন। প্রায় বিশ বছর আগে অবসর নিয়েছেন। তার ৫ ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে।
দুই সপ্তাহ আগেও আব্দুল জলিলের বাড়ির সামনে দুই বিঘা জমি ছিল। বাড়ির সীমানা ঘেষে ছিল ইটের সলিং করা রাস্তা। এখন এর কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। এখন তার ঘরটি শুধু দাঁড়িয়ে আছে। কালীগঙ্গা নদী আর তার ঘরে মাঝে মাত্র কয়েক ইঞ্চির ব্যবধান। তার ঘরটি সপ্তাহ খানেক টিকবে কিনা এই আশঙ্কা করছেন তিনি। এর আগেও তার একটি বাড়ি কালীগঙ্গায় ভেঙে গেছে বলে তিনি জানান। এক কঠিন বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে কালীগঙ্গা নদী পাড়ের শত শত মানুষের জীবন।
মানিকগঞ্জ পৌরসভা ঘেষা নবগ্রাম ইউনিয়নের বেংরুই গ্রাম। এখানে নদীর পাড় ভাঙছে না, মাটি ধসে ও দেবে যাচ্ছে নীচের দিকে। নদী পাড়ের মানুষ একে ভাঙন না বলে, ভূমি ধ্স বলছে।
আব্দুল জলিল বলেন,‘কালীগঙ্গায় সব যাওয়ার পর বাকী আছে ঘরটাসহ এক শতাংশ জমি। এটাও নদী গর্ভে বিলীন হলে কোথায় আশ্রয় নিব। সে চিন্তায় কাটছে প্রতিটি মুহূর্ত। এই গ্রামের মানুষ ভাঙনের কথা স্বপ্নেও কখনো ভাবেনি। অথচ নদী সব কেড়ে নিচ্ছে। ফসলি জমিসহ ঘরবাড়ি সব।’
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, একটি রান্না ঘর আর একটি থাকার ঘর। যেখানে থাকেন আব্দুল জলিল। তার ছেলেরা কালীগঙ্গা নদীর রাক্ষুসে মেজাজে দেখে অনেক আগেই অন্যের জমিতে গিয়ে ঠাই নিয়েছে।
শুক্রবার সকালে ভাঙন কবলিত বেংরুই গ্রামে গিয়ে কথা হয় নবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. তজুমুদ্দিন, ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সদস্য তাসলিমা আক্তারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য বেশ কয়েক জনের সঙ্গে কথা হয়।
তারা জানান, এমন ভাঙন তারা আর কখনও দেখেনি। নদীর পানি বৃদ্ধি কিংবা ঢেউয়ের কারণে নয় ভূমি ধসেই বিলীন হচ্ছে এই গ্রাম। নদীর পারের ঘর-বাড়ি, জমি একের পর এক দেবে যাচ্ছে।
কালীগঙ্গা নদীতে সব হাড়ানোদের একজন আবদুল মোতালেব হোসেন। বয়স ষাটের বেশি।
তিনি জানান, গত ৮/৯ বছরে ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রতি বছরই বসতবাড়ি, মসজিদ-মাদ্রাসা ও হাট-বাজারসহ ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে। দুই বছর ধরে নদীর পাড় দেবে এ ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে। ভাঙন ঠেকাতে শিগগিরই পদক্ষেপ না নিলে এসব জায়গা নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।
ইউপি সদস্য তজুমুদ্দিন বলেন, ‘গত দুই বছর জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা একাধিকবার ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তবে ভাঙনরোধে এখন পর্যন্ত কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি ভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে কালীগঙ্গা নদীর ভাঙন ঠেকাতে এলাকাবাসী নদীর তীরে মানববন্ধন করেছেন।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক এস এম ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনি ওই ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং পাউবো কর্তৃপক্ষকে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন।’