নারায়ণগঞ্জের দেওভোগের নাগবাড়ি এলাকায় খাদ্য সহায়তা চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে শাস্তি পাওয়া ফরিদ আহমেদকে অনুদান দিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহনুর মিয়া। তিনি প্রশাসনের অনুরোধে নিজের তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ এই টাকা দেন। রবিবার (২৩ মে) বিকালে তিনি ফরিদ ও তার স্ত্রী হিরন বেগমকে বাড়িতে ডেকে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে নগদ ৬০ হাজার টাকা তুলে দেন।
উল্লেখ্য, গত বুধবার জাতীয় হটলাইন ৩৩৩ কল করে খাদ্য সহায়তা চান ফরিদ আহমেদ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরা খাদ্য সহায়তা দিতে গিয়ে জানতে পারেন তিনি চারতলা ভবনের মালিক। এজন্য তিনি সরকারি কাজে ব্যঘাত ঘটনোর দায়ে ফরিদ আহমেদকে ১০০ প্যাকেট খাবার গরিব মানুষের মধ্যে বিতরণ করার জন্য নির্দেশ দেন। জেল থেকে বাঁচতে স্ত্রীর স্বর্ণ বন্ধক রেখে এবং চড়া সুদে ঋণ করে ১০০ প্যাকেট খাবার প্রস্তুত করে উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তার কাছে তুলে দেন তিনি। গত শনিবার উপজেলা কর্মকর্তা আরিফা জহুরা উপস্থিত হয়ে অসহায় মানুষের মধ্যে এসব খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেন। কিন্তু পরে জানা যায়, ফরিদ ওই বাড়ির একক মালিক নন। তিনি মাত্র তিনটি রুমের মালিক। করোনা পরিস্থিতিতে অনেক কষ্টে দিনযাপন করছিলেন।
এ ঘটনায় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর জেলা প্রশাসক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে রবিবারের মধ্যে শাস্তি পাওয়া ব্যক্তিকে খাদ্য বিতরণ করতে যে টাকা খরচ হয়েছে তা প্রদানের নির্দেশ দেন। এই সঙ্গে এই ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শামীম বেপারিকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত রির্পোট জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
জাতীয় হটলাইন ৩৩৩ কল করে খাদ্য সহায়তা চেয়ে উল্টো শাস্তি পেলেন ফরিদ আহমেদ– এমন সংবাদ অনলাইন, প্রিন্ট ও ইলেট্রনিক্স মিডিয়ায় প্রচার হলে দিনভর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মুখে পড়ে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ভাইরাল হয়। উপজেলা প্রশাসনের ভুলের কারণেই অসহায় ফরিদ আহমেদকে ১০০ প্যাকেট খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করতে হয়েছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। দিনভর এটি ছিল টক অব দ্য টাউন। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে জেলা প্রশাসন।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ্ জানান, প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ফরিদ আহমেদ চারতলা বাড়ির একা মালিক নন। বাড়িটির মালিক ছয় ভাই ও এক বোন। তিনি বাড়ির মাত্র তিনটি রুমের মালিক। যে কারণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকতাকে রবিবারের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণে যে টাকা খরচ হয়েছে তা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এই ঘটনা কী কারণে ঘটলো তা খুঁজে বের করতে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দশ দেওয়া হয়েছে।
ফরিদ আহমেদ জানান, রবিবার সকালে উপজেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বাড়িতে এসে বিষয়টি তারা দেখেছেন বলে আশ্বস্ত করেন। একই সঙ্গে ওই কর্মকর্তা সাংবাদিক বা মিডিয়ার সঙ্গে কথা না বলার জন্য চাপ দেন। তার পর থেকেই মানসিক অস্বস্তিতে ভুগছিল তার পরিবার। বিকালে টাকা পাওয়ার পর মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে প্রথমে রাজি হননি তারা। পরে অবশ্য তিনি বলেন, ‘আমি ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছি। এখন আমার কোনও রাগ-ক্ষোভ নেই। আমি যাদের কাছে টাকা ধার করেছিলাম তাদের পাওনা বুঝিয়ে দিয়েছি। আমার কপালে শাস্তি ছিল, তা পেয়েছি। খাদ্য সহায়তা চেয়ে হটলাইনে কল করাটাই আমার বড় ভুল হয়েছে।’
ফারিদ আহমেদের স্ত্রী হিরন বেগম দাবি করেন, ‘আমার স্বামী গুছিয়ে কথা বলতে পারেনি। তাই উপজেলা প্রশাসন ভুল বুঝে তাকে শাস্তি দিয়েছে। এই শাস্তির খাবার বিতরণ করত গিয়ে আমাকে স্বর্ণ বন্ধক, চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়েছে।’
এদিকে ফরিদ আহমেদকে আর্থিক সহায়তা প্রদানকারী ব্যবসায়ী শাহনুর মিয়া বলেন, ‘প্রশাসনের অনুরোধ আমি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ৬০ হাজার টাকা দিয়েছি। করোনার কারণে তিনি খুব অসহায়ভাবে দিন যাপন করছিলেন। তাই খাদ্য সহায়তা চেয়ে ৩৩৩ কল করেছিলেন। কিন্তু কোনও একটি ভুলের কারণে তিনি শাস্তি পেয়েছেন। ফরিদ আহমেদের একটি প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে। তিনি আসলেই অসহায়। প্রশাসনের উচিত তার জন্য কিছু করা।’
এদিকে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য দিনভর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরার সরকারি ও ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
আরও খবর: খাদ্য সহায়তা চেয়ে শাস্তি: জরিমানার টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ