কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনার রাংসা বনের আয়তন দিন দিন কমছে। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় অবাধে কেটে ফেলা হচ্ছে গাছপালা। পানির ওপর ভাসমান বনের জীববৈচিত্র্য পড়েছে হুমকির মুখে। এলাকাবাসী বলছেন, এখনই নজর না দিলে কয়েক বছরের মধ্যে অস্তিত্ব হারাবে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা কয়েকশ বছরের পুরোনো রাংসা বন।
ইটনা উপজেলার বড়িবাড়ী ইউনিয়নের শিমুলবাগ গ্রামে গেলে দেখা যায় রাংসা বনের সৌন্দর্য। দূর থেকে দেখে মনে হবে পানির ওপর ভেসে থাকা নিভৃত দ্বীপ। যেখানে রয়েছে হিজল-তমাল-করচসহ নানা গাছ। হাজারো পাখির কলকাকলীতে মুখরিত চারদিক। এ যেন মোহনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। প্রায় দুই হাজার একর আয়তনের বনটি মানুষের অত্যাচারে দিন দিন ছোট হচ্ছে। অবাধে কেটে নেওয়া হচ্ছে গাছপালা। বনের আয়তন ৮০০ একরে নেমেছে। স্থানীয়রা বলছেন, পদক্ষেপ না নিলে কয়েক বছরের মধ্যে বিলীন হবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রাংসা বন।
অনেকে এই বনকে সিলেটের রাতারগুলের সঙ্গে তুলনা করেন। বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও পশুপাখির দেখা মেলে বনে। বর্ষায় ভাসমান বন দেখতে পর্যটকরা ভিড় করেন। প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শীতকালে অতিথি পাখির অভয়াশ্রমে পরিণত হয়। অবাধ পাখি শিকারের ফলে বর্তমানে অতিথি পাখি কমেছে। ওপর থেকে ছবি তুললে ধরা পড়ে বনের বর্তমান করুণ চিত্র।
সরকারি খাস জমিতে গড়ে উঠা বনটি বরাবরই প্রশাসনের নজরের বাইরে থাকায় চলছে দখলের মহোৎসব। পানির সময় চারদিকে অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে চলে মাছ শিকার। পানি শুকিয়ে গেলে গাছপালা কেটে ফসলি জমি তৈরি করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। বন বিভাগ জানিয়েছে, বনটির কর্তৃত্ব তাদের হাতে নেই। ফলে কিছুই করার নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা আমির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বনে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ছিল। অনেকদিন ধরে যে যার মতো গাছপালা কেটে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক গাছ মরেও যাচ্ছে। প্রশাসনের লোকজন এখানে আসেন না। ফলে সবাই বন দখল করছে।’
বড়িবাড়ী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) খোকন মিয়া বলেন, ‘কয়েকশ বছরের পুরোনো রাংসা বন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আগে বিশাল এলাকাজুড়ে গাছপালা ছিল। প্রায় দুই হাজার একরের বনভূমি। এখন তা ৭০০-৮০০ একরে পরিণত হয়েছে। দেখার কেউ নেই। যখন খুশি মানুষ গাছপালা কেটে নেয়। আমরা বাধা দিলে ঝগড়া হয়। প্রশাসন নজর না দিলে এই বন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়।’
কিশোরগঞ্জ বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাংসা বন মূলত বন বিভাগের আওতায় নেই। এ জন্য রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারছি না আমরা। যদি জেলা প্রশাসন থেকে আমাদের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয় তবে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করবো।’
বন উজাড়ের বিষয়টি জানতে পেরে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম। তিনি বলেন, ‘এই বন সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল না। এটি রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি স্থানীয় ইউএনওকে খোঁজখবর নিতে বলবো। আশা করছি, এই প্রাকৃতিক সম্পদ আমরা রক্ষা করতে পারবো।’