গাজীপুরের শ্রীপুরের বরমী ইউনিয়নের ভিটিপাড়ার জঙ্গল থেকে অজ্ঞাত নারীর লাশ উদ্ধারের রহস্য ভেদ করেছে পুলিশ। একমাত্র মেয়ে মায়ের বুকের ওপর বসে গলা ও মাথা টেনে ধরলে ভাড়া করা খুনি জবাই করে তাকে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি ওই গ্রামের গভীর জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা লাশটি শ্রীপুর পৌরসভার ভাংনাহাটী গ্রামের আবু তাহেরের স্ত্রী মিনারা বেগমের। শুক্রবার (৪ মার্চ) দুপুরে কালিয়াকৈর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আজমীর হোসেন এসব তথ্য জানান।
এ হত্যা মামলায় মিনারার একমাত্র মেয়ে শেফালী (৩৫) ও মেয়ের সহকর্মী সোহেল রানাকে (২৫) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শেফালী শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পূর্বখণ্ড (পুকুরপাড়) এলাকার ফরিদের স্ত্রী। সোহেল শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী থানার খড়িয়াকাজিরচর গ্রামের মেরাজ উদ্দিনের ছেলে। তারা দুজনই শ্রীপুরের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন।
শ্রীপুর থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই আমজাদ শেখ জানান, গলাকাটা অবস্থায় অজ্ঞাত হিসেবে নারীর লাশ উদ্ধারের পর থানায় মামলা হয়। তদন্ত শেষে মেয়ে শেফালী ও তার সহকর্মী সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তারা হত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, মাকে মাটিতে শুইয়ে বুকের ওপর বসে দুই হাত দিয়ে মাথা ও গলা টান দিয়ে ধরলে সোহেল ছুরি দিয়ে জবাই করে। পরে মায়ের মৃত্যু নিশ্চিত হলে সহকর্মীকে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে আসেন তারা। এ বিষয়ে তারা গাজীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাকিল আহমেদের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে আসামিরা।
পুলিশ জানায়, শেফালী শিশু থাকা অবস্থায় মিনারা বেগমের স্বামী আবু তাহের তাকে ছেড়ে চলে যান। অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে শেফালীকে লালন-পালন করেন। গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার কেওয়া পূর্বখণ্ড গ্রামের চাঁন মিয়ার ছেলে ফরিদের সঙ্গে ২০ বছর আগে শেফালীর বিয়ে হয়। বর্তমানে তিন সন্তানের মা শেফালী। তিনি স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন এবং স্বামী ফরিদ অটোরিকশা চালান। শেফালী ও ফরিদের সংসারে ঝগড়াবিবাদ লেগেই ছিল। এ নিয়ে শেফালী তার মায়ের বাড়ি পার্শ্ববর্তী শ্রীপুর পৌর এলাকার ভাংনাহাটি গ্রামে থাকতেন। পৈতৃক সূত্রে মিনারা বেগমের ৯ শতাংশ জমি ছিল। ওই জমি তিনি মেয়েকে দিয়েছেন।
এস আই আমজাদ শেখ জানান, শেফালীর টাকার দরকার হলে বিষয়টি মাকে জানান। ওই ৯ শতাংশ জমি ও দুটি গরু বিক্রি করে টাকা দেওয়ার জন্য মিনারা বেগমকে চাপ দেন। এতে মিনারা রাজি না হওয়ায় শেফালীর সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয়। পরে রাগ করে মেয়েকে চড়থাপ্পড় মেরে বাড়ি থেকে বের করে দেন মিনারা। এতে শেফালী ক্ষুব্ধ হয়ে মাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। মাকে হত্যার জন্য সহকর্মী সোহেল রানাকে এক লাখ টাকায় ভাড়া করেন শেফালী। ১৫ হাজার টাকা অগ্রিমও দেন। বাকি ৮৫ হাজার টাকা কাজ শেষে দেবেন বলে জানান।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১০ ফেব্রুয়ারি ওয়াজ শোনার কথা বলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন শেফালী। মাকে নিয়ে কেওয়া এলাকার সিআরসি মোড়ে সোহেলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। এরপর সোহেল এলে মা ও মেয়েসহ তিন জন একটি অটোরিকশায় ওয়াজ শোনার কথা বলে উপজেলার বরমীর উদ্দেশে রওনা দেন। পথে সোহেল একটি সেভেন আপের মধ্যে চেতনানাশক মিশিয়ে মিনারাকে খেতে দেন। সেটি খাওয়ার পর মুহূর্তেই মিনারা অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর তারা বরমীর ভিটিপাড়া গ্রামের সাধুখারটেক এলাকার গভীর জঙ্গলের কাছে পৌঁছে অটোরিকশাটি ছেড়ে দেয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে জঙ্গলের ভেতর নিয়ে শেফালী ইট দিয়ে মায়ের মাথায় আঘাত করেন। এরপর মাকে মাটিতে চিৎ করে শুইয়ে বুকের ওপর বসে দুই হাত দিয়ে মাথা ও গলা টান দিয়ে ধরলে সোহেল ছুরি দিয়ে জবাই করে। মিনারার মৃত্যু নিশ্চিত হলে সোহেল ঘটনাস্থলের পাশে একটি পুকুরে ছুরিটি ফেলে দিয়ে চলে আসে।
কালিয়াকৈর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আজমীর হোসেন বলেন, ‘সামান্য বিষয় নিয়ে মেয়ে মাকে হত্যা করতে পারে- এমন ধারণাই ছিল না পুলিশের। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ একটি ক্লুলেস হত্যা মামলার রহস্য সফলভাবে উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে।’