ভারতে ঘুরতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার নাঈমুর রহমান প্রান্তের লাশ দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। তার লাশ দেশে আসার খবরে বৃহস্পতিবার (১৭ মার্চ) সকালে বেনাপোল স্থলবন্দরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন স্বজনরা।
নিহতের বোনের জামাতা মো. নাজমুল উদ্দিন সারভি বলেন, ‘আমরা বেনাপোল যাচ্ছি, প্রান্তর লাশ আনতে। লাশ পৌঁছতে আরও অনেক সময় লাগবে।’
এর আগে, ১৪ মার্চ রাতে ভারতের গোয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন তিনি। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন একসঙ্গে ঘুরতে যাওয় আরও তিন বন্ধু। তারা হলেন, ফতুল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খন্দকার লুৎফর রহমান স্বপনের ছেলে তাইহান তাবাচ্ছির সোয়াদ (২৫), ফতুল্লা থানা গেট সংলগ্ন আমীর আলী সুপার মার্কেটের মালিক মৃত জহিরুল আলমের দুই ছেলে আলী আকরাম আকিব (২৬) ও আলী আরমান আদিব (২২)। ভারতের গোয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সোয়াদ নিহত প্রান্তর লাশ নিয়ে দেশে ফিরছেন। আর গুরুতর আদিবকে ওই দেশে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনার পর এই তিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন আকিব।
আহত সোয়াদের বাবা খন্দকার লুৎফর রহমান স্বপন বলেন, ‘সোয়াদ বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। সকালে তার সঙ্গে কথা হয়েছে। ওর সঙ্গে নিহত প্রান্তর লাশ ও আহত আদিব রয়েছে। এখন তারা মুম্বাইয়ের কাছাকাছি আছে। আদিবকে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করিয়ে প্রান্তর লাশ নিয়ে দেশে ফিরতে রাত হবে।’
নিখোঁজ আকিবের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই দুর্ঘটনার পর থেকে আকিব নিখোঁজ। তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আকিবের ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে ওই রাতে গাড়ি ড্রাইভ করা হয়েছিল। তার ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে। দুর্ঘটনার পরে সে ভয়ে পালিয়ে গেছে হয়তো।’
তবে আকিব ও আদিবের মা দেলোয়ারা আলম বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘আমার দুই ছেলে আহত হয়েছে। ছোট ছেলে আদিবের সেন্স নেই। সে গুরুতর আহত। তাকে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য শিফ্ট করাচ্ছি।’
বড় ছেলে আকিব চিকিৎসাধীন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আকিব ওদের সঙ্গে নেই। দুর্ঘটনার পরে ওইখান থেকে বের হলে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। জ্ঞান ফেরার পর তার মোবাইল ফোন খুঁজে পায়নি। যে কারণে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। এখন সে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তার চোখে ও গালে আঘাত লেগেছে। গতকাল রাতে ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। আমরা খুব দ্রুতই তাদের দেখতে যাবো।’
এদিকে, বৃহস্পতিবার সকালে নিহতের ফতুল্লা লালপুরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাবা কামাল হোসেন ছেলের শোকে নাওয়া-খাওয়া ভুলে কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ প্রায়। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। এদিকে, একমাত্র ছেলের মৃত্যু বিশ্বাসই করতে পারছেন না মা নাসিমা কামাল। তিন দিন ধরে পাগলের মতো আচরণ করে যাচ্ছেন। কখনও বিলাপ করতে করতে ছেলেকে দেখতে চাইছেন, কখনও ছেলের কাছে ভারতে উড়ে যেতে চাইছেন। কখনও ওপরের দিকে তাকিয়ে ছেলেকে উদ্দেশ করে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘বাবা তুমি কেমন আছো। মায়ের কাছে চলে আসো। তোমাকে ছেড়ে কীভাবে থাকবো। চলে এসো বাবা।’
ছেলের লাশ আসার খবরে নিহতের মা বারবার ছুটে যেতে চাইছেন বেনাপোলে। শেষ পর্যন্ত অনেকটা জোর করেই তাকে বাড়িতে রেখে বেনাপোলের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন স্বজনরা। বাকরুদ্ধ বাবা কামাল হোসেন ছেলের নিথর দেহ আনতে বর্ডারে যেতে রীতিমতো আকুতি-মিনতি করেছিলেন। বুঝিয়ে শুনিয়ে তাকেও বাড়িতে রেখে গেছেন। বাড়িতে বসেই আদরের ছেলের মুখখানা দেখার প্রহর গুনছেন বাবা-মাসহ স্বজনরা।