রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের একটি গ্রাম কুশাহাটা। সারা বছরই গ্রামটি পানিবেষ্টিত থাকে। পড়ালেখার জন্য এখানে কোনও প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় নেই। এক যুগের বেশি সময় ধরে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এই গ্রামের শিশুরা। তবে এই গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ২০১৭ সাল থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ‘পায়াক্ট বাংলাদেশ’ নামে একটি বেসরকারি সংগঠন। তারা ‘কুশাহাটা পায়াক্ট বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। তবে এই বিদ্যালয়ের কোনও ভবন নেই। শিক্ষক ওয়াজউদ্দিনের বাড়ির আঙিনায় গাছতলায় চলে শিশুদের পাঠদান।
জানা গেছে, কুশাহাটা গ্রামটি গোয়ালন্দ উপজেলা থেকে প্রায় ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সম্পূর্ণ গ্রামটি এখন আর নেই। গ্রামের অধিকাংশ ঘরবাড়ি পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে এখানে ৮০ থেকে ১০০ পরিবারের বসবাস। এখানে নেই তেমন সরকারি সুযোগ-সুবিধা। চারপাশ পানি বেষ্টিত হওয়ায় শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন এখানে নেই বললেই চলে। যাতায়াতের একমাত্র ব্যবস্থা নদীপথে ট্রলার অথবা নৌকা।
পায়াক্ট বাংলাদেশের ম্যানেজার মজিবর রহমান জুয়েল জানান, চারদিক পদ্মা-যমুনা নদীবেষ্টিত দুর্গম কুশাহাটা চরের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তারা ২০১৭ সাল থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘কুশাহাটা পায়াক্ট বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নাম দিয়ে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন তারা। স্থানীয় এসএসসি পাস যুবক মো. ওয়াজউদ্দিন সরদারকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিভাবকদের সহযোগিতা ও পায়াক্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত অনুদানে শিক্ষককে নামমাত্র বেতন দেওয়া হয়। এছাড়া সরকারিভাবে বই সংগ্রহ করে বিতরণ ও বছরের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ দিয়ে থাকেন তারা। বর্তমানে সেখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১২২ জন। তাদের জন্য আজ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি কোনও স্কুলঘর। মূলত শিক্ষক ওয়াজউদ্দিনের বাড়ির আঙিনায় গাছতলাতেই চলে শিক্ষা কার্যক্রম।
শিক্ষক ওয়াজউদ্দিন বলেন, ‘ঝড়-রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র-ছাত্রী সংগ্রহ করে আমি ও আমার স্ত্রী তাদের পাঠদান করি। বিনিময়ে যা পাই তাতে সংসার চলে না, খুব কষ্ট হয়। তবু এই দুর্গম চরের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখানে জরুরিভাবে একটি স্কুলঘর নির্মাণ করা, ছাত্র-ছাত্রীদের বসার বেঞ্চ, ব্লাকবোর্ডসহ অন্যান্য উপকরণ দেওয়া ও শিক্ষকের সম্মানি বাড়ানো প্রয়োজন।’
এ প্রসঙ্গে পায়াক্ট বাংলাদেশের সুপারভাইজার শেখ রাজীব জানান, পায়াক্ট বাংলাদেশে যখন শিক্ষা প্রকল্প ছিল তখন কুশাহাটা শিশুদের জন্য একটা স্কুল খোলা হয়। স্কুলের শিক্ষকদের ভাতা হিসাবে নামমাত্র মাসিক ৫০০ টাকা করে দেওয়া হতো। কিন্তু দুই বছর ধরে প্রজেক্ট না থাকায় সেটাও দিতে পারিনি। তবে আমাদের বর্তমান প্রকল্প থাকায় শিক্ষক দুজনকে সম্মানি ভাতা হিসাবে এক হাজার টাকা দিতে পারছি। এখানকার মানুষ খুবই দরিদ্র ও অসচ্ছল। টাকা দিয়ে সন্তানদের পড়ানো তাদের পক্ষে কষ্টকর। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া স্কুল প্রতিষ্ঠা করা কষ্টকর। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া মানসম্মত পড়ালেখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষার্থী অনিকের মা রাশিদা বেগম বলেন, ‘আমার দুই ছেলে এখানে পড়ে। এ জন্য মাসে ২০০ টাকা দিতে হয়। এই টাকা দেওয়াও আমার জন্য কষ্টকর হয়ে যায়। সরকার যদি আমাদের গ্রামে একটা স্কুল করে দেয় তাহলে খুব ভালো হয়।’
আরেক শিক্ষার্থী আকাশীর মা আলেয়া বেগম বলেন, ‘আমরা সারা জীবন কষ্ট করে গেলাম। মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে চাই। সরকার একটি স্কুল করে দিলে বিনা বেতনে আমাদের ছেলেমেয়েদের সেখানে লেখাপড়া করাতে পারবো।’
গত ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে অনলাইনভিত্তিক সামাজিক সংগঠন গোয়ালন্দ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বিদ্যালয়ে কিছু উপকরণ দেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি কাঠের তৈরি ব্রেঞ্চ, ২০০টি কলম, ৬০টি কাঠ পেন্সিল, এক রিম সাদা কাগজ ও দুই প্যাকেট চকলেট। উপকরণগুলো গ্রহণ করেন শিক্ষক মো. ওয়াজউদ্দিন সরদার।
গোয়ালন্দ রাবেয়া ইদ্রিস মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল কাদের শেখ বলেন, ‘পায়াক্টের মাধ্যমে শিক্ষক ওয়াজউদ্দিন ও তার স্ত্রী চরের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যা খুবই প্রশংসনীয়। তবে এটাই যথেষ্ট নয়। সেখানে সরকারিভাবে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা খুব জরুরি। সেই সঙ্গে চরবাসীর স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। এ বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিতে আমি সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. কবির হোসেন বলেন, ‘দৌলতদিয়া ইউনিয়নে কুশাহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে কুশাহাটা গ্রামে একটা স্কুল ছিল। তবে সেটা নদী ভাঙনের কবলে পরে দেবগ্রাম ইউনিয়নে স্থানান্তর করা হয়েছে। কুশাহাটা এলাকা সারা বছর পানিতে আটকে থাকায় সেখানে শিক্ষা ব্যবস্থা খুবই নাজুক পর্যায়ে আছে। ইতোমধ্যে আমরা ওপর মহলে কথা বলেছি, শিগগিরই কুশাহাটার শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে বলে আমি মনে করি।’