ভিত্তিপ্রস্তর করেছিলেন খালেদা জিয়া, সেতু করে দেখালেন শেখ হাসিনা

নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দর উপজেলায় যাতায়াতে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিন দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিলেন। বিএনপির ক্ষমতাকালে দলটির প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন। তবে সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকার তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ করে বন্দরবাসীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলো। এই অর্জনকে আওয়ামী লীগ সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জয় বলে মনে করছেন দলের নেতাকর্মীরা। 

শীতলক্ষ্যা সেতুটি বন্দর উপজেলার মদনগঞ্জ এবং পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সৈয়দপুর এলাকাকে যুক্ত করেছে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্যের নামে সেতুটির নামকরণ হয়েছে, ‘বীর মু্ক্তিযোদ্ধা একেএম নাসিম ওসমান তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু’। 

একাধিক সূত্র জানায়, ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে  শীতলক্ষ্যা নদীর ওপরে সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি শুরু হয়। ওই বছর নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেতু নির্মাণের। তবে তার কথা আর ফুল হয়ে ফোটেনি। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই প্রতিশ্রুতি দেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এসএম আকরাম। তবে শেষ পর্যন্ত আর তার বাস্তবায়ন হয়নি। 

আরও পড়ুন: সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু

পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে নাগরিক ঐক্যে যোগদান করেন এবং বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে সর্বশেষ ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ওই নেতাও তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি। 

এ অবস্থায় ২০০৬ সালের ৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শহরের নবীগঞ্জ খেয়াঘাট এলাকায় সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তবে ক্ষমতায় না আসায় তারা আর কাজ শেষ করতে পারেনি। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদও সেতুর আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে তার কথারও বাস্তবায়ন হয়নি। ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বন্দরের মদনগঞ্জে সমাবেশ করে দ্রুত সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। পরে ২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সেতুর প্রকল্পটি ২০১০ সালে একনেকে অনুমোদন পেলেও নানা কারণে ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তখন বলা হয়েছিল, এই সেতুর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টের অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ সরকারের সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতর। চার লেনে ১৫ মিটার চওড়ায় ৩৫ স্প্যানবিশিষ্ট সেতুর দৈর্ঘ্য হবে এক হাজার ২৯০ মিটার। শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। পরবর্তীতে মেয়াদ বাড়ানো হয়। একইসঙ্গে বাড়ে নির্মাণ ব্যয়। 

আরও পড়ুন: তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু পায়ে হেঁটে পার হলো হাজারো মানুষ 

সেতুর প্রকল্প পরিচালক শোয়েব আহমেদ বলেন, ‘১২৩৪.৫০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি ২২.১৫ মিটার প্রশস্ত। এই সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৬০৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এরমধ্যে ২৬৩ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের তহবিল থেকে এবং ৩৪৫ দশমিক ২০ কোটি টাকা সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) থেকে এসেছে। ছয় লেনের এই সেতুর চারটি লেনে চলবে দ্রুতগতির যান, বাকি দুটি দিয়ে চলবে রিকশা-সাইকেলের মতো ধীরগতির বাহন।’

এদিকে অনেকগুলো সরকার আসা-যাওয়ার মধ্যে শেষ পর্যন্ত সেতু হওয়ায় খুশি স্থানীয় গৃহীনি আসমা বেগম। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন এলেই নেতারা সেতু করে দেওয়ার কথা বলতো, নির্বাচন শেষ হলে সব ভুলে যেতো। তবে আমাদের নদী পারাপারের কষ্টের কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের শীতলক্ষ্যা সেতু উপহার দিয়েছেন, এজন্য তাকে ধন্যবাদ। আমরা চাই এই নদীর ওপর দিয়ে একাধিক সেতু হোক। যাতে করে ভয়ে ভয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনও যাত্রীকে নদী পার হতে না হয়।’ 

বৃদ্ধ রহিম মুন্সী রাজনীতিবিদদের নাম শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা মুখে শুধু বড় বড় কথা বলতে পারেন। কাজের কাজ কিছু করতে পারেন না। ভোটের আগে তারা আমাদের সবকিছু দিয়ে দেওয়ার কথা বলে। আর নির্বাচন শেষ হলে আমাদের কথা মনে রাখেন না। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের স্বপ্ন পূরণ করেছেন। আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ। আগে আমাদের নদী পারাপার হতে অনেক কষ্ট হতো। এখন এই সেতুর ফলে আমাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে।’ 

বিএনপিসহ অন্য দলের নেতাদের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে কথা হয় বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা এম এ রশিদের সঙ্গে। বর্ষীয়ান এই নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপির অনেকে শীতলক্ষ্যা সেতু করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে কোনও কাজ করেননি। অথচ আমরা ১৯৯৬ সালে তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য এসএম আকরামকে নিয়ে সেতুর কাজে বেশ তোড়জোড় চালিয়েছি, চেষ্টা চালিয়েছি। কিন্তু বিএনপির আমলে আমরা কোনও প্রচেষ্টা দেখি নাই। তারা বক্তব্যে নানা কথা বলেছে, বাস্তবে কাজ করেনি। বিভিন্ন রাজনীতিকরা একের পর এক প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেতু নির্মাণ করতে পারেননি। সেই সেতু উপহার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমি মনে করি, এই সেতু উপহারের মধ্য দিয়ে বন্দরবাসীর জয় হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা তথা পুরো আওয়ামী লীগের আরেকটি জয় হয়েছে।’ 

১৯৯১ সালে বিএনপির সাবেক এমপি আবুল কালাম সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন এবং ২০০৬ সালে খালেদা জিয়া শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা এই রকম ধাপ্পাবাজির রাজনীতি করেছে। বিএনপির সাবেক এমপি আবুল কালাম তার বক্তব্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এছাড়া ২০০৮ সালে জাতীয় পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারও কোনও অগ্রগতি দেখি নাই। নির্বাচন এলে ওই রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের কৌশল হিসেবে সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। মূলত বন্দরবাসীর দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছরের দাবি ছিল একটি সেতু। সে কারণে তারা কৌশলের অংশ হিসেবে এই প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিল।’ 

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্দুল কাদির বলেন, জনগণের ভোট নেওয়ার জন্য বিএনপি ও জাতীয় পার্টি সেতু করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এটা জনগণের ভোট প্রাপ্তির একটা কৌশল ছিল। তারা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। 

তবে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহবায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের দাবি, ‘এই সেতু নারায়ণগঞ্জের মানুষের খুব একটা উপকারে আসবে না। নারায়ণগঞ্জের স্বার্থে সেতুটি করা হয়নি। এটা মূলত ঢাকার চাপ কমাতে করা হয়েছে। পদ্মা সেতু দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের লোকজন চট্টগ্রাম-সিলেট-খুলনা যাওয়ার বাইপাস সড়ক হিসেবে এই সেতু ব্যবহার করবে। তাছাড়া যে স্থানে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে, সেখান দিয়ে বন্দর কিংবা নারায়ণগঞ্জের লোকজন যাতায়াত করে না। ফলে জনগণকে এখনও নৌকা ও ট্রলারে করে নদী পারাপার হতে হবে। তাদের ভোগান্তি কমাতে হলে নবীগঞ্জ বা বন্দর খেয়া ঘাটের আশপাশে সেতু নির্মাণ করতে হবে। 

২০০৬ সালে বিএনপির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শীতলক্ষ্যা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘২০০৬ সালে নবীগঞ্জ খেয়া ঘাটে সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল। ওইদিন দিয়ে সেতুটি হলে বন্দরবাসী উপকৃত হতো। কিন্তু ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পরে বর্তমান সরকার (আওয়ামী লীগ) ক্ষমতায় এসে সেই সেতুর কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। জরুরি সরকার ও বর্তমান সরকার সেই কাজ আর এগোতে দেয়নি। যে কারণে সেখান দিয়ে সেতুর কাজ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বন্দরের মানুষের এখনও ভোগান্তি রয়ে গেছে।’

বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালামের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে তিনি বলেন, আমার মনে হচ্ছে-১৯৯৫ সালে তিনি এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরবর্তী মেয়াদে আমাদের দল ক্ষমতায় এলে কাজটা হতো। কিন্তু সে সময় দল ক্ষমতায় আসতে পারেনি। এ বিষয়ে যিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি আরও ভালো বলতে পারবেন।

উল্লেখ্য, ওয়াকওয়েসহ তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুতে ৩৮টি স্প্যান রয়েছে। এরমধ্যে পাঁচটি নদীতে এবং ৩৩টি পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে। হাঁটার পথসহ সেতুটির প্রস্থ ২২ দশমিক ১৫ মিটার। এছাড়া, ছয় লেনের টোল প্লাজা এবং দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাপ্রোচ রোডও নির্মাণ করা হচ্ছে। এই সেতুর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের লোকজন মুন্সীগঞ্জ হয়ে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পৌঁছে যেতে পারবে। এছাড়া পূর্বাঞ্চলের যানবাহনও সরাসরি এই সড়ক দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াত করবে। ফলে রাজধানীর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরের ওপর যানবাহনের চাপ কমবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।