অতিদরিদ্রদের প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

‘এই ইউনিয়নে সাংবাদিক ঢুকতে আমার অনুমতি লাগে’

শরীয়তপুর সদর উপজেলায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি প্রকল্পের শ্রমিকের তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পাঁচ সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন। আংগারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন ও একই ইউপির সদস্য (মেম্বার) গিয়াস উদ্দিনের ছেলে আলিমুল হক ওই পাঁচ সাংবাদিকের ওপর হামলা করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক।

অবশ্য বিষয়টি স্বীকার করে চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘কার অনুমতি নিয়ে ইউনিয়নে ঢুকেছে তারা। এই ইউনিয়নে কোনও সাংবাদিক ঢুকতে আমার অনুমতি লাগে।’

রবিবার (৪ ডিসেম্বর) দুপুরে আংগারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার সময় পাঁচ সাংবাদিকের ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, মোটরসাইকেল ও হেলমেট ভাঙচুর করা হয়েছে।  

হামলার শিকার পাঁচ সাংবাদিক হলেন—দৈনিক প্রথম আলোর শরীয়তপুর প্রতিনিধি সত্যজিৎ ঘোষ, কালের কণ্ঠের শরিফুল আলম ইমন, চ্যানেল ২৪-এর নুরুল আমিন রবিন, এখন টেলিভিশনের কাজী মনিরুজ্জামান ও ক্যামেরাপারসন শাহাদাত হোসেন। তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।

ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি প্রকল্পের শ্রমিকের তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে চেয়ারম্যানের বক্তব্য নিতে রবিবার দুপুরে আংগারিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে যান তারা। চেয়ারম্যানের কাছে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাইলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তাদের ওপর হামলা করেন চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন ও ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দিনের ছেলে আলিমুল হক। তারা এখন টেলিভিশন ও চ্যানেল ২৪-এর ক্যামেরা এবং মাইক্রোফোন ছুড়ে মারেন। সেইসঙ্গে প্রথম আলো প্রতিনিধির মোটরসাইকেল ও হেলমেট ভেঙে ফেলেন। পরে সাংবাদিকদের গালিগালাজ করে প্রাণনাশের হুমকি ও চাঁদাবাজি মামলায় জড়ানোর ভয় দেখান তারা।

সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের আওতায় বছরে দুই দফা ৪০ দিন করে দরিদ্র মানুষ কাজের সুযোগ পান। প্রকল্পের শ্রমিকদের প্রতিদিন ৪০০ টাকা করে মজুরি দেওয়া হয়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তালিকা প্রস্তুত করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় থেকে শ্রমিকদের বিকাশ নম্বরে মজুরি পরিশোধ করা হয়। 

গত নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শরীয়তপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির কাজ শুরু হয়েছে। আংগারিয়া ইউনিয়নে ৬৮ শ্রমিকের অনুকূলে ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ নম্বর ওয়ার্ডের চরচটাং গ্রামে ১৪ শ্রমিক দিয়ে মাটির রাস্তা সংস্কারের কাজ চলছে। এই প্রকল্পের সভাপতি ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দিন। ওই ১৪ শ্রমিকের নামের তালিকায় ইউপি সদস্যের স্ত্রী নাছিমা বেগম, ছেলে আলিমুল হক, মেয়ে সোনিয়া বেগম, পুত্রবধূ হালিমা আক্তার, ভাই আবু সিদ্দিক, ছেলের শাশুড়ি ও শ্যালিকাসহ ১১ জনের নাম রয়েছে। তাদের বিকাশ নম্বরে শ্রমিকের মজুরি দেওয়া হয়।

অথচ ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দিনের পরিবারের কেউ মাটি কাটা শ্রমিকের কাজ করেন না। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে চরচটাং গ্রামে ২০ শ্রমিকের বিপরীতে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দিন তার পরিবারের সদস্যদের বিকাশ নম্বর দিয়ে ওই টাকা উত্তোলন করেছেন। পরে ইউপি সদস্য ৩০ হাজার টাকায় ৫০ মিটার রাস্তা সংস্কার করে প্রকল্পের বাকি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

প্রকল্পের শ্রমিক আব্দুল সরদার বলেন, ‘আমরা সাত শ্রমিক ছয় দিন কাজ করে একটি রাস্তা সংস্কার করেছি। আরেকটি রাস্তার ৯০ মিটার সংস্কার করছি। ওই দুই রাস্তায় আমাদের ৮০ হাজার টাকা বিল দেওয়া হবে। ইউপি সদস্যের ছেলে আলিমুল হক চুক্তি অনুযায়ী আমাদের টাকা দিচ্ছেন।’

শ্রমিকদের তালিকায় অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। আমি কোনও মন্তব্য করতে রাজি নই।’

সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আংগারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রকল্পের নিয়মনীতি যা আছে তা সরকার বুঝবে। অনিয়ম খোঁজা সাংবাদিকদের কাজ না। সাংবাদিকরা ধান্দাবাজ, আমার জানা আছে। তারা কার অনুমতি নিয়ে ইউনিয়নে ঢুকেছে। এই ইউনিয়নে কোনও সাংবাদিক ঢুকতে আমার অনুমতি লাগে।’

এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যোতি বিকাশ চন্দ্র বলেন, ‘অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান প্রকল্পে কোনও পরিবারের একাধিক ব্যক্তির নাম থাকা যাবে না। এক্ষেত্রে ইউপি সদস্য অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আক্তার হোসেন বলেন, ‘চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর হামলা করেছেন বলে শুনেছি। ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা লিখিত অভিযোগ দিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’