কমেছে টাঙ্গাইল শাড়ির দাম, তবু ক্রেতা সংকট

ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। অথচ এবার জমেনি দেশের প্রাচীন ও বৃহৎ ঐতিহ্যবাহী হাটগুলোর অন্যতম টাঙ্গাইলের করটিয়া হাট। এটি টাঙ্গাইল শাড়ির জন্য বিখ্যাত। তুলনামূলক কম দাম ও টাঙ্গাইল শাড়ির প্রাপ্তিস্থান হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ভারতের পাইকারি শাড়ি ব্যবসায়ীরা এই হাটে আসেন। কিন্তু এবার টাঙ্গাইল শাড়ির দাম কমিয়ে ক্রেতা সংকটে ভুগছেন ব্যবসায়ীরা।

বুধবার (১৯ এপ্রিল) সরেজমিনে হাটে গিয়ে দেখা গেছে, কাপড়ের বান্ডিল খুলে বসে আছেন বিক্রেতারা। প্রত্যাশা অনুযায়ী দেখা মিলছে না ক্রেতার। যেখানে দিনে একজন ব্যবসায়ীর শাড়ি বিক্রি হয় আট থেকে ১০ লাখ টাকার। সেখানে দিনে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার শাড়ি। এমন চিত্র প্রায় সব দোকানের। ফলে বিপাকে পড়েছেন টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী ও তাঁতিরা।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের প্রাচীন ও বৃহৎ কাপড়ের হাট করটিয়া। কম দাম ও বিখ্যাত টাঙ্গাইল শাড়ির প্রাপ্তিস্থান হওয়ায় ব্যবসায়ীদের অন্যতম পছন্দ এই হাট। এই হাটে ব্যবসায়ী ও তাঁতিরা টাঙ্গাইল শাড়ি বিক্রি করেন। করোনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর হাট আবার চালু করে ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। অথচ এবারের ঈদে হাটবার মঙ্গলবার ও বুধবার দুই দিনে বড় পাইকারের দেখা পাননি ব্যবসায়ীরা। খুচরা ক্রেতাও তেমন ছিল না। এ অবস্থায় হতাশা ও দুশ্চিন্তায় ভুগছেন শাড়ি ব্যবসায়ী ও তাঁতিরা।

কাপড়ের বান্ডিল খুলে বসে আছেন বিক্রেতারা, প্রত্যাশা অনুযায়ী দেখা মিলছে না ক্রেতার

করটিয়া হাটে টাঙ্গাইল শাড়ি বিক্রি করতে আসা ব্যবসায়ী আব্দুল মোত্তালিব বলেন, ‘এবার ঈদে বেচাকেনা খুবই কম। স্বাভাবিক সময়ের মতোও বিক্রি হচ্ছে না। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে পাঁচ লাখ টাকার শাড়ি বিক্রি হতো, সেখানে গত দুই দিনে এক লাখ টাকার শাড়ি বিক্রি করেছি। ক্রেতা নেই বললেই চলে। এ জন্য লোকসানে পড়ার শঙ্কায় আছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনার লকডাউনের সময় অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে আমাদের। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এখনও হিমশিম খাচ্ছি। ওই ক্ষতি পূরণ হবে না। এরই মধ্যে বেড়েছে সুতার দাম। অথচ কাপড়ের দাম বাড়েনি, বরং কমেছে। তবু ক্রেতা নেই।’

একই হাটে শাড়ি বিক্রি করতে আসা ব্যবসায়ী ও তাঁতি মো. মামুন বলেন, ‘হাটে ক্রেতা নেই বললেই চলে। হঠাৎ ক্রেতাশূন্য। গত ঈদে যে ক্রেতা ছিল, এবার তার অর্ধেকও নেই। প্রতি শাড়িতে ১০০-১৫০ টাকা করে কমেছে। আমরা অসহায় তাঁতি, বিপদে আছি। এবার প্রচুর বিক্রির প্রত্যাশা ছিল। অথচ তেমন কিছুই হয়নি।’

টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী ও তাঁতি শাহআলম বলেন, ‘বেচাকেনার অবস্থা খুবই খারাপ। ঈদের সময় এমনটা আশা করিনি। ঈদে সব কাপড় বিক্রি হয়। কিন্তু এবার ক্রেতা নেই বললেই চলে। মাত্র কয়েক হাজার টাকার শাড়ি বিক্রি করেছি।’

ক্রেতা সংকটে বিপাকে পড়েছেন টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী ও তাঁতিরা

দুদিনে সাত পেটি কাপড় বিক্রি করেছি উল্লেখ করে টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী ইমরান হোসেন বলেন, ‘হাটে এবার ক্রেতা নেই। দাম কমলেও চাহিদা নেই। এক মাস আগেও এক জোড়া সাধারণ কাতান শাড়ির দাম ছিল ১২০০ টাকা, এখন জোড়ায় কমেছে ১০০-১৫০ করে। তবু বেচাকেনা নেই।’

শান্তি শাহা নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি ও সুতি ব্লক শাড়ি বিক্রি করি। হাটে ক্রেতা নেই। প্রতিটি শাড়ির দাম কমলেও ক্রেতা বাড়েনি। সুতি শাড়ি এক মাস আগে প্রতি পিস বিক্রি হতো ৬০০ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকা। সুতি ব্লক শাড়ি বিক্রি হতো ৬০০ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৪০ টাকা।’

একই হাটের ব্যবসায়ী মো. রফিক বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১২ পেটি শাড়ি বিক্রি হয়েছে। অন্যান্য ঈদে বিক্রি হতো প্রায় ১৫০ পেটি কাপড়। এবার লোকসান হয়েছে, কর্মচারীর খরচও ওঠেনি। কাপড়ের দাম প্রতি পিসে কমেছে ৫০-১০০ টাকা।’

এবারের ঈদে হাটবার মঙ্গলবার ও বুধবার দুই দিনে বড় পাইকারের দেখা পাননি ব্যবসায়ীরা

কেন ক্রেতা সংকট তা নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি করটিয়া হাট কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান আনসারী। তিনি বলেন, ‘টাঙ্গাইল শাড়ির তাঁতিরা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। দেশের বাইরে থেকে যেসব রঙ, সুতা ও কেমিক্যাল আসতো, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে এখন আসছে না। এজন্য রঙ, সুতার দাম বেড়েছে। তবু শাড়ির দাম বাড়েনি। এক মাস আগে যে বিক্রি হয়েছে, এখন তা অর্ধেকে নেমেছে। পাইকাররা তাদের দোকানে যেসব কাপড় নিয়েছেন, সেখানেও তুলনামূলক বিক্রি কম। এ জন্য তাঁতিরা খারাপ অবস্থায় আছেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ঈদে শাড়ি বিক্রি কমেছে। কেন কমেছে, তা জানি না।’