রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়া বাসটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। ঢাকার উদ্দেশে বাসটির ছাড়ার সময় ছয় জন যাত্রী ছিলেন। এরপর একে একে বিভিন্ন কাউন্টার থেকে যাত্রী ওঠানো হয়। সব মিলিয়ে বাসটি অন্তত ৫০ জন যাত্রী ছিলেন বলে কাউন্টার মাস্টার জানিয়েছেন। ডুবে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। অসুস্থ অবস্থায় গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চিকিৎসাধীন আছেন আরও একজন। সাত-আট জন সাঁতরে তীরে উঠতে পেরেছেন। এই হিসাবে এখনও অন্তত ৩৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
বুধবার (২৫ মার্চ) বিকাল সোয়া ৫টার দিকে ঘাটের ৩ নম্বর পন্টুন থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি পড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। সোয়া ৫টার দিকে বাসটি নদীতে পড়ে গেলেও দৌলতদিয়া ২ নম্বর ফেরিঘাটে থাকা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা রাত সাড়ে ৯টার দিকে উদ্ধারকাজ শুরু করে। দেরিতে উদ্ধারকাজ শুরু করা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে রাত ১১টা পর্যন্ত কাউকে উদ্ধার করা যায়নি।
উদ্ধারকাজ দেরি হওয়ার বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার সময় দৌলতদিয়া ২ নম্বর ফেরিঘাটে ছিল উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা। সেখান থেকে ৩ নম্বর ঘাটে আসতে দুই মিনিটের পথ। অথচ এক ঘণ্টা পর হামজা ঘটনাস্থলে আসে। এরপর তার টানতে এবং হামজার অবস্থান নির্ণয় করতে আরও এক ঘণ্টা লেগে যায়। এরই মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়। ফলে উদ্ধারকাজ শুরু করতে পারেনি। রাত ৯টার দিকে বৃষ্টি থামলে উদ্ধারকাজ শুরু হয়।
মারা যাওয়া দুজন হলেন- রেহেনা বেগম (৬০) ও মর্জিনা বেগম (৫৫)। রেহেনার বাড়ি রাজবাড়ীর ভবানীপুর এলাকায়। মর্জিনা বেগমের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। চিকিৎসাধীন আছেন নুসরাত (২৯) নামের এক নারী। তিনি পেশায় একজন চিকিৎসক। তবে নিখোঁজ কারও এখন পরিচয় পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসটি নদীতে উল্টে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয়দের সহায়তায় বেশ কয়েকজন বের হয়ে তীরে আসতে পারেন। আর বাকি যাত্রীরা নদীতে তলিয়ে যান।
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ড. শরীফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাস দুর্ঘটনায় তিন জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে দুজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্যজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে এসেছেন জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার, জেলা সিভিল সার্জন, উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব দফতরের কর্মকর্তারা। তারা এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন বেলা ২টা ২০ মিনিটে সৌহার্দ্য পরিবহন নামে বাসটি কুষ্টিয়া কুমারখালী পৌরবাস টার্মিনাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বুধবার বেলা ২টা ২০ মিনিটে কুমারখালী থেকে ছয় জন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যায় বাসটি। দৌলতদিয়া ঘাটে পন্টুনে ওঠার সময় নদীতে পড়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরির দল উদ্ধার অভিযান শুরু করে। এখন পর্যন্ত এক নারী ডাক্তারকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। সাত-আট জন সাঁতরে তীরে উঠলেও বাকিরা নিখোঁজ আছেন।
সৌহার্দ্য পরিবহনের কুমারখালী পৌরবাস টার্মিনালে অবস্থিত বাসটি কাউন্টার মাস্টার মো. তন্বয় শেখ বলেন, দুপুরে বাসটিতে ছয় জন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যায়। এরপর খোকসা থেকে সাত জন, মাছপাড়ায় চার জন, পাংশায় ১৫ জন ওঠেন। ইঞ্জিন কাভারেও চার জন যাত্রী ছিলেন। এ ছাড়া গোয়ালন্দ ঘাটে কয়েকজন যাত্রী ওঠেন। চালক, সুপারভাইজার ও চালকের সহকারীসহ বাসে অন্তত ৫০ জন ছিলেন।
কাউন্টার মাস্টারের ভাষ্য, ৪৫ সিটের বাস হলেও ৫০ জন ছিলেন। আবার ফেরিতে ওঠার সময় কেউ কেউ নেমেও যান। ফলে নদীতে পড়ার সময় কত জন যাত্রী ছিলেন সেটি নিশ্চিত নয়।
দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন বলেন, ‘বিকাল ৫টার কিছু পর সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে আসে। এ সময় ঘাটে থাকা একটি ফেরি যানবাহন নিয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। অল্পের জন্য তাতে উঠতে না পারায় অপর ফেরির জন্য বাসটি অপেক্ষা করছিল। সোয়া ৫টার দিকে ওই ঘাটে ‘হাসনা হেনা’ নামক একটি ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি এসে সজোরে পন্টুনে আঘাত করে। ফেরির ধাক্কায় নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।’
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, ডুবে যাওয়া যাত্রীবাহী বাসটি পানির ৩০ ফুট গভীরে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে প্রচুর ঝোড়ো বৃষ্টির কারণে রাত ৯টা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়েছে। রাত ৯টার দিকে বৃষ্টি থামার পর পুরো দমে উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী যান হামজার সহযোগিতায় বাসটি উত্তোলনের চেষ্টা চলছে। বাসটি রাত ১০টা পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি।









