ভারত মহাসগরে সোমালিয়ার জলদস্যুদের হাতে জিম্মি আছেন টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার হোসাইন মো. সাব্বির। ইতোমধ্যে জলদস্যুরা জাহাজটি সোমালিয়ার দিকে নিয়ে গেছে। জাহাজটিতে থাকা বাংলাদেশিদের মোবাইল নিয়ে যাওয়ায় কেউ স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন স্বজনরা। ফলে মঙ্গলবার দুপুর থেকে বুধবার রাত ১০টা পর্যন্ত সাব্বিরের কোনও খোঁজ পাননি বাবা-মা। ছেলের জন্য অঝোরে কাঁদছেন তারা।
জাহাজে থাকা ২৩ বাংলাদেশির মধ্যে নাগরপুর উপজেলার ডেক ক্যাডেট হোসাইন সাব্বির একজন। তিনি উপজেলার সহবতপুর ইউনিয়নের ডাঙা ধলাপাড়া গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে। মঙ্গলবার দুপুরে সাব্বিরের পরিবার জানতে পারে জাহাজটি জলদস্যুরা জিম্মি করে সোমালিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে। এমন খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েন প্যারালাইজড বাবা, মা ও একমাত্র বোন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সাব্বির উপজেলার সহবতপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে এসএসসি পাস করেন। ২০১৬ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারি এম এম আলী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিতে। সেখান থেকে পাস করে ২০২২ সালের জুন মাসে এমভি আব্দুল্লাহ জাহাজে মার্চেন্ট কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন।
সাব্বিরের চাচাতো ভাই আহম্মেদ হোসেন রানা বলেন, সাব্বিররা এক ভাই এক বোন। পরিবার অসচ্ছল। অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় সাব্বির ছোটবেলা থেকেই মামার বাড়ি সহবতপুর ইউনিয়নের কাজির পাচুরিয়ার এলাকায় থেকেছেন এবং সেখান থেকেই পড়াশোনা করেছেন। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে প্যারালাইজড হয়ে শয্যাশায়ী সাব্বিরের বাবা। ছেলের জাহাজে চাকরি হওয়ার পর মা শয্যাশায়ী স্বামীকে নিয়ে সহবপুর বাবার বাড়িতে বসবাস করেন। সহবতপুরের ডাঙা ধলাপাড়া গ্রামে এখন কেউ আর থাকে না। একমাত্র উপার্জনক্ষম সাব্বিরের কিছু হয়ে গেলে তাদের আর চলার পথ থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, শুনেছি জলদস্যুরা জাহাজটি সোমালিয়ায় নিয়ে গেছে। মঙ্গলবার দুপুর থেকেই সাব্বিরের ফোন বন্ধ। আমরা কোনও যোগাযোগ করতে পারছি না। এখনও পরিবারের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। কারও কাছে মুক্তিপণ চেয়েছে কিনা তাও জানি না। আমরা দ্রুত জাহাজটিতে থাকা সবাইকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি।
সাব্বিরের বোন মিতু আক্তার বলেন, ‘ভাইয়ের সঙ্গে আমার সর্বশেষ সোমবার কথা হয়েছে। এ সময় মাথা ন্যাড়া করার কয়েকটি ছবি পাঠিয়েছিল। ছবি নিয়ে আমরা দুজনে অনেক হাসাহাসি করেছি। ওই দিন বিকালে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য বারবার ফোন করেছে। কিন্তু বাবার ফোন বন্ধ ছিল। পরে আর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারেনি। এর মধ্যে মঙ্গলবার দুপুরে জাহাজটি জলদস্যুদের কবলে পড়েছে। এমন খবর গণমাধ্যমে দেখার পর তার ফোনে বারবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারিনি। ফোনটি বন্ধ পাচ্ছি। বাবা-মা শুধু কাঁদছেন। কিছুতেই থামাতে পারছি না। সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে কেউ এখনও যোগাযোগ করেনি। আমার ভাইটিকে সুস্থ অবস্থায় ফেরত চাই।’
সহবতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোফায়েল মোল্লা বলেন, জলদস্যুদের কবলে পড়ায় সাব্বিরের পরিবার খুবই দুশ্চিন্তায় পড়েছে। কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তার বাবা-মা ও বোনসহ আত্মীয়-স্বজন। ফোন বন্ধ থাকায় দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে। ছেলেটি ওই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের সবাইকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানাই।
নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধান বলেন, ‘সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। আশা করছি, দ্রুত একটি সুখবর পাওয়া যাবে।’
এর আগে মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় দুপুর দেড়টার দিকে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর নিয়ন্ত্রণ নেয় সোমালিয়ার জলদস্যুরা। জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে দুবাই যাচ্ছিল। জলদস্যুদের কবলে পড়া চট্টগ্রামের কবির গ্রুপের জাহাজটি পরিচালনা করছে গ্রুপটির সহযোগী সংস্থা এস আর শিপিং লিমিটেড। জাহাজে ২৩ বাংলাদেশি আছেন। জিম্মি হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছেন তাদের স্বজনরা।