বাণিজ্যমেলায় ফিরছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য

পূর্বাচলের বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে আয়োজিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় আধুনিক ও বিদেশি পণ্যের ভিড়ের মধ্যেও আলাদা করে নজর কাড়ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈরি গৃহস্থালি ও শৌখিন সামগ্রী। রঙিন প্যাভিলিয়ন আর ঝলমলে পণ্যের ভিড়েও মৃৎশিল্পের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ প্রমাণ করছে—মাটির জিনিসের আবেদন এখনও ফুরিয়ে যায়নি।

মেলায় অংশ নেওয়া দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পণ্যের স্টল ও প্যাভিলিয়নের মধ্যে শাহপরান মৃৎশিল্পের প্যাভিলিয়নটি ক্রেতাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মেলার মূল ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম কর্ণারে অবস্থিত এই প্যাভিলিয়নে ঢুকলেই চোখে পড়ে মাটির তৈরি শত শত ধরনের গৃহস্থালি ও সাজসজ্জার সামগ্রী।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বিকালে সরেজমিনে দেখা যায়, প্যাভিলিয়নের দেয়ালজুড়ে স্তরে স্তরে সাজানো রয়েছে মাটির তৈরি সাধারণ প্লেট, বিরিয়ানির প্লেট, কাপ-পিরিচ, গ্লাস, ডিনার সেট, হাঁড়ি, গামলা, ফুলদানি, ব্যাংক, ওয়ালমেট, মোমদানি, ল্যাম্প, পুতুল, শোপিস ও নানা ধরনের গিফট আইটেম। নানান রঙ, নকশা ও আকৃতির এসব পণ্যের সামনে থেমে যাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। অনেকেই পছন্দ অনুযায়ী কিনে নিচ্ছেন প্রয়োজনীয় সামগ্রী।

একসময় গ্রামবাংলার দৈনন্দিন জীবনে মাটির তৈরি জিনিসপত্রই ছিল গৃহস্থালির প্রধান অনুষঙ্গ। সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক ও মেলামাইন পণ্যের দখলে পড়ে যায় সেই জায়গা। ফলে ধীরে ধীরে হারাতে বসে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। তবে এখনও অনেক মানুষের মনে মাটির জিনিসের প্রতি আলাদা টান রয়ে গেছে। বিশেষ করে রাজধানীতে আড়ংসহ হাতে গোনা কয়েকটি দোকান ছাড়া সহজে মাটির তৈজসপত্র পাওয়া যায় না। সে কারণে বাণিজ্যমেলা নগরবাসীর জন্য এসব পণ্য কেনার বড় সুযোগ হয়ে উঠেছে।

মেলায় মাটির তৈরি পণ্য কিনতে আসা গৃহিণী শামিমা বেগম বলেন, আধুনিকতার কারণে এখন মাটির জিনিসপত্রের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। তবে প্লাস্টিক বা মেলামাইনের তুলনায় মাটির তৈরি সামগ্রী বেশি স্বাস্থ্যকর। পাশাপাশি দেখতে সুন্দর এবং দামও তুলনামূলক কম। এসব কারণেই তিনি মাটির তৈজসপত্র কিনছেন বলে জানান।

একই প্যাভিলিয়ন থেকে কেনাকাটা করছিলেন স্কুলশিক্ষক মোতাহার হোসেন। তিনি বলেন, ঘর সাজাতে সবচেয়ে বেশি দরকার রুচিবোধ। অল্প খরচেই মাটির তৈরি জিনিসপত্র দিয়ে ঘরকে সুন্দরভাবে সাজানো যায়। মাটির পুতুল, ফুলদানি, মোমদানি কিংবা ল্যাম্প ঘরের পরিবেশকে সহজেই আকর্ষণীয় করে তোলে। তাই ভিন্ন ধাঁচের কিছু শোপিস কিনেছেন তিনি।

শাহপরান মৃৎশিল্প স্টলের বিক্রয় প্রতিনিধি শোয়েব আহমেদ জানান, মেলার প্রথম দুদিন বিক্রি তুলনামূলক কম ছিল। তবে তৃতীয় দিন থেকে ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। এখনও অনেক মানুষের কাছে মাটির তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রীর আলাদা কদর রয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্টলের মালিক শাহপরান বলেন, তিনি ২০ বছরের বেশি সময় ধরে মাটির তৈরি গৃহস্থালি ও শৌখিন পণ্য নিয়ে কাজ করছেন। তার তৈরি পণ্যগুলো ৮৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়, ফলে এগুলো কাচের সামগ্রীর চেয়েও বেশি টেকসই। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে মাটির তৈরি এসব পণ্যের চাহিদা বেশি বলে জানান তিনি।

দামের বিষয়ে তিনি বলেন, কাপ-পিরিচ প্রতি পিস ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, থালা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, ফুলদানি ১২০ থেকে ২০০ টাকা, ব্যাংক ৪০ থেকে ২০০ টাকা, ওয়ালমেট ২০০ থেকে ৩০০ টাকা এবং মাটির হাঁড়ি ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এবার মেলায় বেচাবিক্রি আগের তুলনায় ভালো হবে বলে আশাবাদী তিনি।

উল্লেখ্য, এবারের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বিভিন্ন ক্যাটাগরির মোট ৩২৭টি প্যাভিলিয়ন, স্টল ও রেস্টুরেন্ট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে দেশীয় উৎপাদক ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সাধারণ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে।

মেলায় দর্শনার্থীদের যাতায়াত সুবিধার্থে কুড়িল বিশ্বরোড, ফার্মগেট (খেজুরবাগান/খামারবাড়ি), নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিআরটিসির ২০০টির বেশি ডেডিকেটেড শাটল বাস বাণিজ্য মেলার উদ্দেশে চলাচল করছে।