বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ মেলা। গ্রামবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বছরের বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের মেলা বসে। এর অংশ হিসেবে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইল এলাকায় প্রায় আড়াইশত বছর ধরে বসছে ‘জামাই মেলা’। এটি মাছের মেলা নামে শুরু হলেও পরে জামাই মেলা হিসেবে পরিচিতি পায়। এটি এখন শুধু কেনাবেচার স্থান নয় বরং স্থানীয়দের কাছে সামাজিক বন্ধন, আবেগ ও ঐতিহ্যের মিলনমেলা।
প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে এ মেলার আয়োজন করা হয়। পৌষ মাসের শেষ দিন পুরো এলাকা উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে এদিন মেয়ের জামাইদের আমন্ত্রণ জানানো এবং তাদের শ্বশুরবাড়িতে আগমনকে কেন্দ্র করে মেলাটির নাম ‘জামাই মেলা’ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে বড় বড় মাছ কেনাবেচা হওয়ায় এটি মাছের মেলা নামেও পরিচিত।
মেলার যাত্রা শুরুর ইতিহাস নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা মত রয়েছে। কারও কারও ভাষ্যমতে, এটি মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পৌষ সংক্রান্তি পূজা থেকে শুরু হয়েছিল। আবার কারও ভাষ্য, পৌষ সংক্রান্তির সময় স্থানীয়রা মেয়ের জামাইদের দাওয়াত দিতো। সেই দাওয়াতে আসার সময় জামাইরা শ্বশুরবাড়িতে উপহার হিসেবে মাছ নিয়ে আসতেন। সময়ের পরিবর্তনে এটি এখন জামাই মেলা নামে পরিচিত। বর্তমানে সবাই এই মেলাকে জামাই মেলা বা মাছের মেলা নামেই চেনেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মেলা বিনিরাইল গ্রামে সীমাবদ্ধ নেই; আধা কিলোমিটার দূরে কাপাইস গ্রামে এটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে নাম ও ঐতিহ্য বিনিরাইলের সঙ্গেই যুক্ত। একসময় ছোট পরিসরে মাছের মেলা থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় বড় বাণিজ্যিক ও সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়। কালীগঞ্জ ছাড়াও গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ অংশ নেন।
মেলার প্রধান আকর্ষণ বড় বড় মাছ। চিতল, বোয়াল, বাঘাইর, রুই, কাতল, আইড়, কালিবাউশ, পাবদা, গুলশা, গলদা চিংড়ি, বাইম, কাকিলা ও রূপচাঁদার মতো দেশি ও সামুদ্রিক মাছ এখানে পাওয়া যায়। কখনও কখনও এক মণ ওজনের বাঘাইর বা কাতল মাছও মেলায় আসে। যা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। দেশের বিভিন্ন মৎস্য খামারি ও জেলেরা সারা বছর বড় মাছ সংগ্রহ করে এই মেলার জন্য প্রস্তুতি নেন।
একদিনের মেলায় কোটি টাকার বেচাকেনা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। প্রায় তিন শতাধিক ব্যবসায়ী মাছসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে মেলায় অংশ নেন। মাছ ছাড়াও মিষ্টির দোকান, আসবাবপত্র, খেলনা ও নানা ধরনের গ্রামীণ পণ্যের পসরা বসে। পাশাপাশি পুতুল নাচ, নাগরদোলা ও লাঠি খেলার মতো গ্রামীণ বিনোদনের আয়োজনও থাকে, যা মেলাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। এখানে জামাই ও শ্বশুরদের মধ্যে বড় মাছ কেনার এক ধরনের প্রতিযোগিতাও দেখা যায়। যেখানে অনেকে হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত দামের মাছ কেনেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই মেলা শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, বরং সামাজিক সম্পর্কের এক শক্তিশালী মাধ্যম। এটি পরিবারগুলোর মধ্যে বন্ধন তৈরি করে এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়।
কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) কিশোর আকন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিনিরাইল গ্রামে প্রায় আড়াইশ বছর আগে একটি দেবাল (হিজল গাছের মতো) গাছ ছিল। সেই গাছের গোড়ায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা দুধ দিয়ে পূজা করতেন। পূজার সময় সেখানে অনেক মানুষের সমাগম হতো। এসব কথা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা। আবার আমরা ছোটবেলাতেও তা দেখেছি। বর্তমানে সেই স্থানে বাড়িঘর নির্মিত হওয়ায় আগের মতো সেখানে মেলা হয় না। এখন আধা কিলোমিটার পূর্ব দিকে কাপাইস গ্রামে মেলা হয়। এটি এখন জামাই মেলা নামে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলা বছরের পৌষ মাসের শেষ দিন বা মাঘ মাসের প্রথম দিনে জমজমাট মেলা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৮শ শতকের দিকে স্থানীয় এক জমিদারের উদ্যোগে মেলার সূচনা হয়। শুরুতে এটি ছিল ক্ষুদ্র ও সীমিত পরিসরে, যা নবাবি উৎসবের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরবর্তীতে জামাই মেলা হিসেবে পরিচিতি পায়। কারণ এই দিনে জামাইদের (মেয়ের স্বামীদের) বিশেষভাবে আপ্যায়ন ও দাওয়াত দেওয়া হয়।’
স্থানীয় সংবাদকর্মী আশরাফুল আলম আইয়ুব বলেন, ‘একসময় বট গাছের নিচে পূজাকে কেন্দ্র করে মেলার সূচনা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় আকার ধারণ করেছে। পরে জামাই মেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।’
মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রায় আড়াইশত বছরের পুরোনো এই মেলা এখন শুধু উৎসব নয়, আমাদের সংস্কৃতির উজ্জ্বল প্রতীক। সময় বদলালেও এর ঐতিহ্য ও আকর্ষণ কমেনি। মাছের সমারোহ, জামাই-শ্বশুরের সম্পর্ক এবং গ্রামীণ মানুষের আন্তরিকতায় এই মেলা আজও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে আছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম কামরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিনিরাইলের জামাই মেলা ঐতিহ্যের অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি গ্রামীণ সমাজের সম্পর্ক, সংস্কৃতি ও উৎসবের মিলনস্থল। কেউ মাছ কিনতে, কেউ আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে, আবার কেউ শুধু ঐতিহ্য উপভোগ করতে আসেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঐতিহ্যবাহী মেলাটিকে সফলভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়।’