‘আমাদের এলাকায় দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই। বাকি ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে। বিদ্যুৎ নিয়ে আমাদের এলাকার মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। অনেক কষ্টে আছি। বলে বোঝাতে পারবো না।’ লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এভাবেই কথাগুলো বলেছেন গাজীপুরের শ্রীপুরের কাওরাইদ রেলওয়ে স্টেশন এলাকার বাসিন্দা সেলিম মিয়া। তিনি বলেন, ‘পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাওনা জোনাল অফিসের আওতাধীন কাওরাইদ সাবস্টেশনের অধীনে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং থাকে আমাদের এলাকায়।’
একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে তীব্র লোডশেডিং। এমন পরিস্থিতি শ্রীপুরের মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দিনে-রাতে সমানতালে লোডশেডিংয়ের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে জীবনযাত্রা। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে তিন থেকে চার ঘণ্টাও আসে না। কোথাও কোথাও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেশি। শহরাঞ্চলে কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামে গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য শিক্ষাসহ সবখানেই নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এ নিয়ে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছেন তারা।
মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি বিশেষ করে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পোল্ট্রি খাত। বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের কুলিং ফ্যান, ভেন্টিলেশন ও অনিয়মিত পানির সরবরাহের কারণে মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।
বাসাবাড়ির মালিকেরা বলছেন, ৪০ থেকে ৫০ মিনিট পর পর বিদ্যুৎ চলে যায়। ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে গরমে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। উপজেলা সদরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে ভয়াবহ লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে মানুষ।
শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা এলাকার পোল্ট্রি খামারি মনির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেই খামারের ভেতরে গরম অসহনীয় হয়ে যায়। ফ্যান বন্ধ থাকলে মুরগি হাঁপাতে থাকে। গত কয়েকদিনের লোডশেডিংয়ের কারণে আমার খামারে প্রায় শতাধিক ব্রয়লার মুরগি মারা গেছে।’
আরেক খামারি সোহেল রানা বলেন, ‘গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে খামারের ভেতরে তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। ফ্যান ও পানির লাইন বন্ধ হয়ে মুরগি অস্থির হয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে মুরগির মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। এখন লাভের চেয়ে লোকসানের চিন্তাই বেশি করছি আমি।’
একই কথা বলেছেন বরমী ইউনিয়নের গাড়ারন এলাকার দুগ্ধ খামারি জুবায়ের আহমেদ। তিনি বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে গরুর দুধ অনেক কমে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হয়। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বহন করা কঠিন। বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, কিন্তু বাজারে সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যায় না।’
বরমী ইউনিয়নের কাশিজুলি গ্রামের কৃষক মোবাশ্বের আলী বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টা আমরা বিদ্যুৎ পাই না। বর্তমানে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে কী যে দুর্ভোগে আছি, বলে বোঝাতে পারবো না।’
শ্রীপুর পৌরসভার লিচু বাগান এলাকার গৃহবধূ মাহফুজা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারা দিনে কতবার বিদ্যুৎ যায়, তার হিসাব নেই। এক সপ্তাহ ধরে শুধু রাতেই পাঁচ-ছয় ঘণ্টা ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। গরমের কারণে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। বাচ্চাদের ঠিকমতো পড়াশোনাও হচ্ছে না।’
বরমীর পাইটালবাড়ী গ্রামের গৃহিণী রহিমা খাতুন বলেন, ‘সাত দিন পরপর সবুজ সবজি ও অন্যান্য কাঁচামাল কিনে ফ্রিজে রেখে দিই। দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজের মামালসহ খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমাতে পারছি না। রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়ছি।’
খামারি আবু তাহের বলেন, ‘একটি খামার চালাতে সারাক্ষণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু দিনে-রাতে এত বেশি লোডশেডিং হচ্ছে যে ঠিকমতো মুরগি পালন করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।’
বরমী এলাকার আরেক খামারি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঋণ নিয়ে খামার করেছি। বিদ্যুৎ না থাকলে ছোট বাচ্চা মুরগি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে। কয়েকদিন ধরে ঘনঘন লোডশেডিংয়ে খামারে স্বাভাবিক পরিবেশ রাখা কঠিন হয়ে গেছে। ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে মুরগির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, রোগবালাইও বাড়ছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ময়মনসিংগহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর শ্রীপুর জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আনোয়ারুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেছে। একইসঙ্গে উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করতে হচ্ছে। শ্রীপুর উপজেলা সদর অংশটুকু বিদ্যুৎ পাচ্ছে রাজাবাড়ী এবং রাজেন্দ্রপুর গ্রিড থেকে। এই অংশে ডিমান্ড আছে ৫০ মেগাওয়াটের মতো। এখানের লোকজন লোডশেডিং পাচ্ছেন ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশের মতো। চাহিদার তুলনায় অন এভারেজে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মতো কম পাচ্ছি আমরা।’
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর শ্রীপুরের মাওনা জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শান্তনু রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাওনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ১২০ মেগাওয়াট এবং শ্রীপুরে ২১২ মেগাওয়াট। আমরা ৩টা গ্রিড থেকে পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ পাই। শ্রীপুর গ্রিডে পাচ্ছি ২৫ শতাংশের মতো লোডশেডিং। শ্রীপুর গ্রিডে ডিমান্ড আছে ১০৫ মেগাওয়াটের মতো। ক্যালকুলেশনে ৮০ শতাংশের মতো আসে পিক আওয়ারে। অফ পিক আওয়ারে লোডশেডিং আরও কম থাকে। মূলত চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় ঘাটতি মোকাবিলায় প্রতিদিন লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।’
একই কথা বলেছেন গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আবুল বাশার আজাদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই জোনে মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ মিলছে ৩১২ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় ১৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ না পাওয়ায় গড়ে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে জেলায় গড়ে সাত-আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এই সমিতি গাজীপুর শহর ছাড়াও কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। সেখানে আরও বেশি লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।’