চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলায় তীব্র লোডশেডিং ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভের জেরে পল্লী বিদ্যুতের সাব-স্টেশন থেকে এক কর্মীকে তুলে নিয়ে মারধর ও কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় তার কাছ থেকে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।
মঙ্গলবার উপজেলার চির্কা গ্রামে অবস্থিত পল্লী বিদ্যুতের সাব-স্টেশনে এ ঘটনা ঘটে। পরে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা স্থানীয় ব্যক্তিদের সহায়তায় ওই কর্মীকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছেন ভুক্তভোগী বিদ্যুতের লাইনম্যান মো. আবদুল কাদের। বুধবার (২৪ জুন) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফরিদগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এরশাদ উল্লাহ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ফরিদগঞ্জ জোনাল কার্যালয়ের অধীন চির্কা উপকেন্দ্রে মঙ্গলবার সকালে লাইনম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মো. ইব্রাহিম ও মো. আবদুল কাদের। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে একদল যুবক উপকেন্দ্রে প্রবেশ করে প্রথমে ইব্রাহিমকে মারধর করেন। পরে তারা আবদুল কাদেরকে জোর করে উত্তর ধানুয়া গ্রামে নিয়ে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে পল্লী বিদ্যুতের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (ওঅ্যান্ডএম) মোহাম্মদ নাজির উল্লাহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সমঝোতা বৈঠক করেন। পরে সেখান থেকে আবদুল কাদেরকে উদ্ধার করা হয়।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, হামলাকারীরা আবদুল কাদেরকে মারধরের পাশাপাশি তার কাছে থাকা ২৩ হাজার ৫০০ টাকা ছিনিয়ে নেয় এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ভেঙে ফেলে। পরে স্থানীয় কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তির সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
ওই রাতেই পল্লী বিদ্যুতের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. সাইফুল আলম বাদী হয়ে চার জনের নাম উল্লেখ করে ফরিদগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। আজ সকালে মামলা করেন ভুক্তভোগী। মামলায় ধানুয়া গ্রামের জাফর মিজি, ফারুক পাটোয়ারী ও জসিমসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত কয়েকদিন ধরে ওই এলাকায় তীব্র লোডশেডিং চলছিল। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ বিলও অস্বাভাবিকভাবে বেশি আসছিল। এসব বিষয়ে বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনও প্রতিকার না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ জনতার মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এছাড়া সোমবার রাতে আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়ার খেলার সময় অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যায়। এ অবস্থায় আর্জেন্টিনার হাজারো সমর্থকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। এসবের জন্য ওই এলাকার সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীকে মারধর করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন, ‘কোনও প্রকার নোটিশ ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, অথচ বিল আসছে অতিরিক্ত। বিদ্যুতের অভিযোগ কেন্দ্রে ফোন দিলে তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে চরম খারাপ আচরণ করে। ঘটনার দিন স্থানীয় জনতা উপকেন্দ্রে গেলে লাইনম্যান আবদুল কাদের সবার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয়রা তাকে ধরে নিয়ে আসেন। পরে এজিএম সাহেবের ফোনের পর আমরা স্থানীয় কয়েকজন মিলে বসে বিষয়টি সমাধান করি। এখন মামলা করেছে মানুষকে হয়রানি করার জন্য।’
পল্লী বিদ্যুৎ সাম্প্রতিক সময়ে যে পরিমাণ লোডশেডিং ও অতিরিক্ত বিল করছে, তাতে সাধারণ মানুষের ক্ষুব্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম শেখ। তিনি বলেন, ‘সমাধানের জন্য গেলে তারা কোনও কর্ণপাত করে না। আমি জানতে পেরেছি, ওই লাইনম্যান আবদুল কাদেরও স্থানীয়দের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে খারাপ আচরণ করেছেন।’
পল্লী বিদ্যুত ফরিদগঞ্জ জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. সাইফুল আলম বলেন, ‘উপকেন্দ্রের ভেতরে থাকা যন্ত্রপাতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ বা হস্তক্ষেপ করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দায়িত্ব পালনরত কর্মীর ওপর হামলা ও মারধর আইনত গুরুতর অপরাধ। এজন্য মামলা করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ আইন ও প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনুরোধ করা হয়েছে।’
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ অঞ্চলের প্রধান জিএম আতিকুল হক চৌধুরী বলেন, ‘গত সোমবার রাতে এবং দিনে ফরিগঞ্জসহ কিছু এলাকায় লোডশেডিং ছিল। ওই এলাকায় সোমবার আর্জেন্টিনার খেলা চলাকালীন কিছু সময়ে লোডশেডিং ছিল। যা নিয়মমত হয়ে থাকে। কিন্ত সব জায়গায় না। এই নিয়মের বাহিরে যাওয়ার সুযোগও নাই। আমাদের বিদ্যুৎ সাপ্লাইয়ের ওপর নির্ভর করে লোডশেডিং করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘এখন প্রচণ্ড গরম। তাই বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে গেছে। কিন্তু এসব কারণে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে হামলা, কর্মীকে তুলে নিয়ে মারধর, টাকা ছিনতাই তো করতে পারে না। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। চলতি বিশ্বকাপ চলাকালে বিদ্যুৎ সরবারহ স্বাভাবিক রাখার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি আমরা।’
ফরিদগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আল আমিন বলেন, ‘পল্লী বিদ্যুতের কর্মীকে মারধর ও আটকে রাখার ঘটনায় মামলা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’









