গোপালগঞ্জে ১৬ জুলাইকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা এড়াতে ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ করতে র্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। মূলত গত বছরের এই দিনে এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে হওয়া সংঘর্ষে পাঁচ জন নিহতের ঘটনার বর্ষপূর্তিতে সম্ভাব্য নাশকতা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ঠেকাতে এই বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। শহরে মানুষের যাতায়াতও স্বাভাবিক। এই সময়ের মধ্যে কোথাও কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি। তবে বাড়তি নিরাপত্তা দেখে আতঙ্কে আছেন স্থানীয় লোকজন।
আতঙ্কের কথা জানিয়ে শহরের ভ্যানচালক জমির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা দিন আনি দিন খাই। গত বছরের ঝামেলার পর অনেক দিন ভ্যান চালাইতে পারি নাই। সংসার চালাইতে কষ্ট হইছে। এবার আবার ১৬ জুলাই পুলিশ-বিজিবি দেখতাছি। আবার কিছু হবে নাকি? এই ভয়ে আছি। তবে বিকাল পর্যন্ত ভ্যান চালাইতে পারছি।’
দিনমজুর এনাম শেখ বলেন, ‘১৬ জুলাইর মতো অবস্থা আমরা চাইনে। ভয়ে ১৫/২০ দিন বাড়ি ঘুমাতি পারি নাই। এহন আবার ১৬ জুলাই আইছে। ফেসবুকে মিছিল দেখতিছি। কী হয় জানিনে। তয় আমরা অশান্তি চাইনে।’
বাসশ্রমিক দিলদার হোসেন বলেন, ‘নিরাপত্তা দিতি বিজিবি আইছে। পুলিশ কাজ করতিছে। আমাগে গাড়ি চালানোর কাজ আমরা চালায় যাতি চাই। এজন্নি সরকারের কাছে নিরাপত্তা চাচ্ছি। নাশকতা না হলি ভালো হয়। তারপরও অজানা আতঙ্কের মধ্যি আছি।’
২০২৫ সালের এই দিনে এনসিপির ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দফায়-দফায় সংঘর্ষে পাঁচ জন নিহত হন।
ওই দিন এনসিপির সমাবেশস্থল, জেলা প্রশাসকের বাসভবন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, জেলা কারাগারে হামলা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া সমাবেশস্থলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ভাঙচুর করা হয় শহরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম সংলগ্ন জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারার পাশাপাশি কারফিউ জারি করে। এমন পরিস্থিতিতে এনসিপি নেতৃবৃন্দ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আশ্রয় নেন। পরে সেনাবাহিনীর এপিসিতে করে কঠোর নিরাপত্তর মধ্যে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
এসব ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী ও টুঙ্গিপাড়া থানায় পৃথক ১৫টি মামলা করে। এসব মামলায় এজাহারনামীয় ১ হাজার ১৫ জন আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাত আসামি রয়েছেন ১৪ হাজার ৭৬০ জন। এখন পর্যন্ত ৪৪১ জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারের পাঠিয়েছে পুলিশ।
দিনটিকে ঘিরে জেলার নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বুধবার থেকে গোপালগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির সদস্যরা টহল শুরু করেছেন। তাদের সঙ্গে র্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে টহল দিচ্ছে। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। পাশাপাশি সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা।
আজ সকাল সাড়ে ৯টায় শহরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম সংলগ্ন পুনঃনির্মাণাধীন ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে’ জুলাই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে প্রশাসন। এ সময় গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর, জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান, পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ, জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফ রফিকুজ্জামানসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
যে কারণে এত নিরাপত্তা
গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ বলেন, ‘গোপালগঞ্জকে অন্য জেলার থেকে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে না। গোপালগঞ্জের মানুষ শান্তিপ্রিয়, তাই ১৬ জুলাইও জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।’
তিনি বলেন, ‘গত বছরের ১৬ জুলাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৫টি মামলা হয়েছে। তদন্ত শেষে এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। নির্দোষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।’
জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান বলেন, ‘১৬ জুলাই ও ১৫ অগাস্টকে কেন্দ্র করে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েনের জন্য অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠির প্রেক্ষিতেই গোপালগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। শুধু ১৬ জুলাই বা ১৫ আগস্ট নয় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিরতি দিয়ে দিয়ে বিজিবি মোতায়ন করা হবে সেটি আইনশৃঙ্খলা ও মনিটরিং কমিটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এটি আমাদের রুটিন কাজেরই অংশ।’