গোপালগঞ্জে ১৬ জুলাইকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা এড়াতে ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ করতে র্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। মূলত গত বছরের এই দিনে এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে হওয়া সংঘর্ষে পাঁচ জন নিহতের ঘটনার বর্ষপূর্তিতে সম্ভাব্য নাশকতা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ঠেকাতে এই বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
গত বছরের ঘটনা
২০২৫ সালের এই দিনে এনসিপির ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দফায়-দফায় সংঘর্ষে পাঁচ জন নিহত হন।
ওই দিন এনসিপির সমাবেশস্থল, জেলা প্রশাসকের বাসভবন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, জেলা কারাগারে হামলা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া সমাবেশস্থলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ভাঙচুর করা হয় শহরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম সংলগ্ন জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারার পাশাপাশি কারফিউ জারি করে। এমন পরিস্থিতিতে এনসিপি নেতৃবৃন্দ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আশ্রয় নেন। পরে সেনাবাহিনীর এপিসিতে করে কঠোর নিরাপত্তর মধ্যে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
এসব ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী ও টুঙ্গিপাড়া থানায় পৃথক ১৫টি মামলা করে। এসব মামলায় এজাহারনামীয় ১ হাজার ১৫ জন আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাত আসামি রয়েছেন ১৪ হাজার ৭৬০ জন। এখন পর্যন্ত ৪৪১ জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারের পাঠিয়েছে পুলিশ।
আজকে কী অবস্থা
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। শহরে মানুষের যাতায়াতও স্বাভাবিক। এই সময়ের মধ্যে কোথাও কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি।
এর মধ্যে সকাল সাড়ে ৯টায় শহরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম সংলগ্ন পুনঃনির্মাণাধীন ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে’ জুলাই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে প্রশাসন। এ সময় গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর, জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান, পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ, জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফ রফিকুজ্জামানসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
দিনটিকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে চাপা আতঙ্ক থাকলেও জনজীবন স্বাভাবিক আছে। শহরের ভ্যানচালক জমির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা দিন আনি দিন খাই। গত বছরের ঝামেলার পর অনেক দিন ভ্যান চালাতি পারি নাই। সংসার চালাতি কষ্ট হইছে। এবার আবার ১৬ জুলাই পুলিশ, বিজিবি দেখতিছি। আবার কিছু হবে নাকি? ভয় করে। বিকাল পর্যন্ত ভ্যান চালাইতে পারছি। কিছু হয় নাই।’
দিনমজুর এনাম শেখ বলেন, ‘১৬ জুলাইর মতন অবস্থা আমরা চাইনে। ভয়ে ১৫/২০ দিন বাড়ি ঘুমাতি পারি নাই। এহন আবার ১৬ জুলাই আইছে। ফেসবুকে মিছিল দেখতিছি। কী হয় জানিনে। তয় আমরা অশান্তি চাইনে।’
বাসশ্রমিক দিলদার হোসেন বলেন, ‘নিরাপত্তা দিতি বিজিবি আইছে। পুলিশ কাজ করতিছে। আমাগে গাড়ি চালানোর কাজ আমরা চালায় যাতি চাই। এজন্নি সরকারের কাছে নিরাপত্তা চাচ্ছি। নাশকতা না হলি ভালো হয়। তারপরও অজানা আতঙ্কের মধ্যি আছি।’
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মিছিল
এদিকে, ১৬ জুলাইকে ‘গণহত্যা দিবস’ আখ্যা দিয়ে এবং আহত-নিহতদের স্মরণে মঙ্গলবার ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার তিলছাড়া বিক্ষোভ মিছিল করেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। মিছিল প্রতিহত করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। রাতইল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. নান্নান খাকীর মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও আগুন দেয় বিক্ষোভকারীরা। পরে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এ ব্যাপারে কাশিয়ানী থানার ওসি মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা ও হামলার ঘটনায় এর মধ্যেই ছাত্রলীগের ১৫ জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।’
দিনটিকে ঘিরে জেলার নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বুধবার থেকে গোপালগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির সদস্যরা টহল শুরু করেছেন। তাদের সঙ্গে র্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে টহল দিচ্ছে। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। পাশাপাশি সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা।
কেন এত নিরাপত্তা
পুলিশ ও জেলা প্রশাসন বলছে, ওই ঘটনার বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে যাতে কেউ নতুন করে বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা সৃষ্টি করতে না পারে, তার জন্য জেলা প্রশাসন আগাম সতর্কতা গ্রহণ করেছে। জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৫ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির পাশাপাশি র্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে টহল দিচ্ছে। শহরের প্রবেশপথ ও মোড়ে মোড়ে নতুন চেকপোস্ট বসানো হয়েছে এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।
যা বলছে প্রশাসন
গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ বলেন, ‘গোপালগঞ্জকে অন্য জেলার থেকে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে না। গোপালগঞ্জের মানুষ শান্তিপ্রিয়, তাই ১৬ জুলাইও জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।’
তিনি বলেন, ‘গত বছরের ১৬ জুলাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৫টি মামলা হয়েছে। তদন্ত শেষে এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। নির্দোষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।’
গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান বলেন, ‘১৬ জুলাই ও ১৫ অগাস্টকে কেন্দ্র করে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েনের জন্য অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠির প্রেক্ষিতেই গোপালগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। শুধু ১৬ জুলাই বা ১৫ আগস্ট নয় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিরতি দিয়ে দিয়ে বিজিবি মোতায়ন করা হবে সেটি আইনশৃঙ্খলা ও মনিটরিং কমিটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এটি আমাদের রুটিন কাজেরই অংশ।’









