প্রাথমিকের প্রশ্নপত্রে বিভ্রাট, পরীক্ষা দিতে গিয়ে ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা

ঢাকার ধামরাইয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় টার্মিনাল মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রথম দিনের ইংরেজি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র নিয়ে নানা ধরনের সমস্যায় পড়েছে শিক্ষার্থীরা। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় প্রশ্নপত্র কম, কোথাও এক শ্রেণির প্রশ্নের প্যাকেটের মধ্যে পাওয়া গেছে অন্য শ্রেণির প্রশ্ন। আবার কোনও কোনও প্যাকেটে প্রশ্নপত্রের একটি অংশ ছাপা হয়নি। এ কারণে অনেক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা শুরু করতে দেরি হয়। কোথাও শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত প্রশ্নপত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে।

সোমবার (১৭ আগস্ট) ধামরাই উপজেলার ১৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একযোগে দ্বিতীয় টার্মিনাল মূল্যায়ন পরীক্ষা শুরু হয়। প্রথম দিনের পরীক্ষায় এসব অসঙ্গতির ঘটনা ঘটে বলে কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

স্থানীয় কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রশ্নপত্রের ঘাটতির কারণে কোনও কোনও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করিয়ে রাখতে হয়েছে। একটি বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্ন ছয়টি কম ছিল। অন্য কয়েকটি বিদ্যালয়ে একই শ্রেণির প্রশ্ন পাঁচটি, সাতটি ও ১৭টি পর্যন্ত কম থাকার কথা জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভাড়ারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণির প্রশ্নের প্যাকেটে দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্ন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির প্যাকেটে প্রথম শ্রেণির বাংলা প্রশ্ন পাওয়া যায়। বিদ্যালয়টিতে প্রথম শ্রেণিতে ২২ ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৪২ শিক্ষার্থী ছিল। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক জানান, দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্নপত্রের ঘাটতি ছিল ২০টি।

চন্দ্রপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের প্যাকেট খুলে বাংলা বিষয়ের প্রশ্ন পাওয়া যায়। সেখানে প্রশ্নপত্রও কম ছিল বলে জানা গেছে।

প্রশ্নপত্রের ঘাটতি মেটাতে কোনও কোনও বিদ্যালয় থেকে প্রশ্ন ফটোকপি করতে পাঠানো হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে আলাদা কক্ষে অপেক্ষা করতে হয়। একটি বিদ্যালয়ে ১৭ শিক্ষার্থীকে প্রশ্নপত্রের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

শিক্ষকদের ভাষ্য, শুধু প্রশ্নের সংখ্যা কম বা প্যাকেট বদলে যাওয়াই নয়, কোনও কোনও প্রশ্নপত্র পুরোপুরি ছাপা হয়নি। কোনও কোনও পৃষ্ঠার একটি অংশ ছাপা থাকলেও বাকি অংশ ফাঁকা ছিল। ফলে পরীক্ষার সময় প্রশ্নপত্র নিয়ে বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের সমস্যায় পড়তে হয়।

এর মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। দ্রুত প্রশ্ন ফটোকপি করে দেওয়ার সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীদের অপেক্ষার সময় বেড়ে যায়। এতে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শুরু করা নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বক্তব্য দিয়েছেন।

একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘দ্বিতীয় শ্রেণির তিনটি ইংরেজি প্রশ্ন কম পড়েছিল। প্যাকেটেও ভুল ছিল। সব তো চেক করা হয়নি। আসলে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন খোলা হয় না। প্রশ্ন দেওয়ার সময় খুলতে গিয়ে এ ধরনের সমস্যা হয়েছে।’

ওই শিক্ষক আরও বলেন, ‘প্রথম শ্রেণির প্যাকেটেও ভুল ছিল। প্রথম শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্নের প্যাকেটের ভেতরে দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্ন ছিল। আবার দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্নের প্যাকেটের ভেতরে প্রথম শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্ন ছিল। এ ছাড়া প্রথম শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্নের সংখ্যাও একটি কম ছিল।’

আরেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, তার বিদ্যালয়ে প্রশ্নপত্রের ঘাটতি না থাকলেও কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাকে ফোন করে প্রশ্ন কম থাকার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, চার-পাঁচটি বিদ্যালয়ে এ ধরনের সমস্যা হয়েছে বলে তাকে জানানো হয়েছে। তবে তিনি নিজে বিষয়গুলো দেখেননি বলে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।

প্রশ্ন তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়, একাধিক বিদ্যালয় বা কয়েকটি ইউনিয়নের বিদ্যালয় মিলে তৈরি করতে পারে। শিক্ষকরা প্রশ্ন তৈরি করে প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে গোপনীয়তা বজায় রেখে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়ার কথা।

তবে ধামরাইয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের উদ্যোগে প্রশ্নপত্র তৈরি ও সরবরাহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রথম টার্মিনাল মূল্যায়ন পরীক্ষার ক্ষেত্রেও উপজেলা শিক্ষা অফিস প্রশ্ন তৈরি করেছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এ জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্ন তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি পাঁচ টাকা এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে ছয় টাকা করে নেওয়া হয়।

দ্বিতীয় টার্মিনাল মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্ন উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে তৈরি করা হবে না বলে আগে জানিয়েছিলেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোবাখখারুল ইসলাম মিজান।

পরে এ পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরির জন্যও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য জনপ্রতি ১০ টাকা এবং তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির জন্য ১২ টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলে কয়েকজন শিক্ষক জানান।

ধামরাইয়ে ১৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। ফলে প্রশ্নপত্র তৈরির নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পরিমাণ কয়েক লাখ টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা। এ অর্থ নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং প্রশ্নপত্র তৈরির দায়িত্ব উপজেলা শিক্ষা অফিস কেন নিলো, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভ

পরীক্ষার হলে গিয়ে প্রশ্নপত্র না পাওয়া বা ভুল প্রশ্ন পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অনেক শিক্ষার্থীকে প্রশ্নপত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। এতে পরীক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়েছে বলে শিক্ষক ও অভিভাবকেরা জানিয়েছেন।

একাধিক অভিভাবক বলেন, শিশুদের মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এমন ভুল কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রশ্ন কম থাকা, ভুল প্যাকেটে অন্য শ্রেণির প্রশ্ন থাকা কিংবা অসম্পূর্ণ প্রশ্ন সরবরাহের কারণে শিশুদেরই ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। তারা ঘটনার কারণ খুঁজে বের করে দায়িত্ব নির্ধারণের দাবি জানান।

শিক্ষকদের কয়েকজনও প্রশ্নপত্র সরবরাহের আগে যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্নপত্রের সংখ্যা, শ্রেণি ও বিষয়ের নাম যাচাই করা হলে এ ধরনের সমস্যা এড়ানো সম্ভব ছিল।

প্রশ্নপত্রের ঘাটতি ও ভুলের বিষয়ে জানতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোবাখখারুল ইসলাম মিজানকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মামুন বলেন, বিষয়টি আমিও শুনেছি এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি। এই ত্রুটি কীভাবে এবং কার স্তরে হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে আমরা একটি তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করছি। বিষয়টি সম্পূর্ণ যাচাই-বাছাই করা হবে। এই তদন্তে যার বা যাদেরই গাফিলতি বা দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। জড়িতদের বিরুদ্ধে শতভাগ আইনি ও কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।