‘আরামেই থাকতে চাইয়েন, ইয়ার বাইরে যাইতে না কইরেন, নাইলে বাড়ির ইট সুদ্ধা থাকবো না’—ঢাকার ধামরাইয়ে মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন নামে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে গিয়ে এমন হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি রাফিজুল ইসলাম রবিনের বিরুদ্ধে।
রবিনের দাবি, সাদ্দাম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একটি মিছিলে অর্থায়ন করেছেন। তবে সাদ্দামের দাবি, পারিবারিক বিরোধের জেরে তাকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। তার কোনও রাজনৈতিক পদ বা দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
ভুক্তভোগী সাদ্দাম হোসেন ধামরাইয়ের ভাড়ারিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাঙালপাড়া এলাকার বাসিন্দা। ভাড়ারিয়া বাজারে তার একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে।
গত ১৪ আগস্ট উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি রাফিজুল ইসলাম রবিন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ৫ মিনিট ২৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে সাদ্দামের বাড়ির সামনে এক নারীর সঙ্গে রবিনকে কথা কাটাকাটি করতে দেখা যায়। এ সময় তার সঙ্গে আরও ১০ থেকে ১৫ জন ছিলেন।
ভিডিওতে রবিনকে ওই নারীকে বলতে শোনা যায়, ‘আরামেই থাকতে চাইয়েন। ইয়ার বাইরে যাইতে না কইরেন।’
ওই নারী এর প্রতিবাদ করলে রবিন বলেন, ‘নাইলে বাড়ির ইট সুদ্ধা থাকবো না। পুরুষ মানুষ আছে? থাকলে বইলেন। ডাউটিয়া যাইয়া মিছিল করার সাহস পাইলো কেমনে?’
একপর্যায়ে সাদ্দামের চাচাকে উদ্দেশ করে রবিন বলেন, ‘ধামরাই শান্তিপ্রিয়, সবাই আরামে আছে, ভালো আছে। কোনো নাশকতা আছে? আপনের ভাইস্তা দুই-তিন দিন আগে ডাউটিয়া যাইয়া মিছিল করে আসছে। দেশে অস্থিতিশীল করার পায়তারা করছে।’
ভিডিওতে আরেক নারী রবিন ও তার সঙ্গে থাকা লোকজনের প্রতিবাদ করেন। এ সময় রবিনের সঙ্গে থাকা একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘এখানে সবাই ছাত্রদলের।’
ভিডিওতে ওই নারী আরও বলেন, ‘কীসের ছাত্রদল, সন্ত্রাসী তোরা। কোপাইতে আসো বাড়িতে।’
প্রতিবাদ করার একপর্যায়ে রবিন সাদ্দামের স্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এই জোরের জন্য পস্তান লাগবো।’ পরে সাদ্দামকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার জন্যও বলেন তিনি।
রাফিজুল ইসলাম রবিন ও সাদ্দাম হোসেন দুজনই জানান, ভিডিওটি ১৪ জুলাই ধারণ করা হয়েছে। এর কয়েক দিন আগে ধামরাইয়ের ডাউটিয়া এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একটি মিছিল হয়েছিল।
ছাত্রদল নেতার বক্তব্য
রাফিজুল ইসলাম রবিনের দাবি, ওই মিছিলে সাদ্দাম অর্থায়ন করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এক-দেড় মাস আগে ডাউটিয়া বাসস্ট্যান্ডে ছাত্রলীগের একটি ঝটিকা মিছিল হয়। সেই সুবাদে জেলা থেকে আমাকে ফোন দেওয়া হয়। খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি, ভাড়ারিয়ার সাদ্দাম নামে একজন ওই মিছিলে অর্থায়ন করেছেন।’
রবিনের দাবি, সাদ্দামকে এর আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং তিনি প্রায় তিন মাস কারাগারে ছিলেন। এরপর সাদ্দামের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করে আসেন তিনি।
রবিন বলেন, বাসায় গিয়ে তার গার্ডিয়ানকে বলেছি, আপনার ছেলে মিছিল-মিটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত আছে এবং অর্থ দিচ্ছে। আমরা একটু সাবধান করে দিয়ে এসেছি, যাতে আর উচ্ছৃঙ্খল না হয়। নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন যেন রাজপথে নামতে না পারে, সেটাই বলে এসেছি।
বাড়িতে যাওয়ার সময় কথা কাটাকাটি ও চিৎকার-চেঁচামেচি হয়েছে দাবি করে রবিন বলেন, এ কারণেই সাদ্দাম তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন।
ব্যবসায়ীর অভিযোগ, পারিবারিক বিরোধ থেকেই হয়রানি
সাদ্দাম হোসেনের দাবি, ছাত্রদল নেতা রবিনের সহযোগী জাকারিয়ার পরিবারের সঙ্গে তাদের পারিবারিক বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জেরেই তাকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
সাদ্দাম বলেন, রবিনের সহযোগী জাকারিয়ার খালা আমার সাবেক মামী। তাকে আমার মামা ডিভোর্স দিয়েছেন। তখন আমরা মামার পাশে দাঁড়াই। এই বিষয় নিয়েই প্রথম ঝামেলা শুরু।
তার দাবি, পারিবারিক জমির কাগজপত্রের কাজ করে দেওয়ার পরও বিরোধ তৈরি হয়। পরে তাকে রাজনৈতিক মামলায় ফাঁসিয়ে তিন মাস কারাগারে রাখা হয়।
সাদ্দাম বলেন, জেল থেকে জামিনে আসার পর আমাকে বলা হয়েছে, এক সপ্তাহের মধ্যে আরও মামলা দেওয়া হবে, ১৪টি বিভিন্ন থানায় মামলা হবে। এরপর থেকে ভয়ে ঠিকমতো বাড়িতে থাকতে পারি না। দোকানেও যেতে পারি না।
বাড়িতে গিয়ে হুমকির বিষয়ে সাদ্দাম বলেন, রবিন ২০-২৫ জন লোক নিয়ে আমার বাড়িতে আসে। তারা বলে, আমি মিছিল করেছি এবং মিছিলে টাকা দিয়েছি। পরে আমার মা, স্ত্রী ও চাচিকে গালাগালি ও ধমক দেয়। বলে যায়, বাড়ির একটা ইটও থাকবে না।
সাদ্দামের অভিযোগ, পরে একজন তার সঙ্গে মীমাংসার কথা বলে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রবিন।
রবিন বলেন, আমার তার কাছে এ ধরনের কথা বলার প্রশ্নই আসে না। সে ছাত্রলীগ হওয়ায় সেখানে গিয়েছি।
তবে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের আরও কতজন নেতাকর্মীর বাড়িতে তিনি গিয়েছেন—এমন প্রশ্নের কোনও জবাব দেননি রবিন।
আতঙ্কে সাদ্দামের পরিবার
ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে দিন কাটছে সাদ্দামের পরিবারের সদস্যদের।
সাদ্দামের মা জাহানারা বেগম অভিযোগ করেন, বাড়িতে এসে তাকে ছেলেকে বের করে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখন বলা হয়, ‘শান্তিতে ঘুমাইয়া আছিলেন না? আজকে থেকে শান্তির ঘুম হারাম কইরা দিমু।’
সাদ্দামের স্ত্রী তাইয়েবা আক্তার বলেন, বাড়িতে এসে তাকে সাদ্দামের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। পরে তাকে বলা হয়, সাদ্দামকে বাড়ি থেকে বের হতে দেওয়া হবে না এবং বাইরে পেলে মারধরের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
তাইয়েবা বলেন, এখন আমি, আমার শাশুড়ি আর সাদ্দামকে আমরা বের হইতে দেই না। ভয় লাগে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ ইকবাল বলেন, বিষয়টি আমরাও দেখেছি। এ বিষয়ে সংগঠনে কথা বলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান বলেন, কেউই আইন হাতে তুলে নিতে পারেন না। কেউ আক্রান্ত বোধ করলে আইনের সহায়তা নিতে পারেন। অভিযোগ করা হলে পুলিশ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।









