রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সহিংসতা, অর্থনৈতিক মন্দা ও জ্বালানি সংকটে গত দুই বছরে নারায়ণগঞ্জের শিল্প খাতে অস্থিরতা বেড়েছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে কর্মহীন হয়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। তবে জুলাই আন্দোলনের পর নারায়ণগঞ্জে ঠিক কতটি কারখানা বন্ধ হয়েছে, তা নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের (ডিআইএফই) হিসাবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের আওতাধীন ৪৬টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির তথ্যমতে, জুলাই আন্দোলনের পর থেকে জেলায় ১১০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়েছেন।
অন্যদিকে, গ্যাস সংকটের প্রভাব তুলে ধরে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, সংকটের সময়ে প্রায় ৩০০টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এর মধ্যে কিছু সচল হয়েছে, তবে বেশিরভাগই অচল আছে।
আগুন-লুটপাটে বন্ধ গাজী গ্রুপের দুই কারখানা
জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক সহিংসতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে রূপগঞ্জের গাজী গ্রুপের দুটি কারখানায়। রূপসী এলাকায় গাজী পাইপ ও ডোর কারখানা এবং খাদুন এলাকায় গাজী টায়ার্স কারখানায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
কারখানা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রথম দফায় দুটি কারখানাতেই হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়। পরে ওই বছরের ২৪ আগস্ট রাতে সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী গ্রেফতার হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ২৫ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় কারখানা দুটিতে ব্যাপক লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে গাজী টায়ার্স কারখানায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ঘটনার সময় গাজী টায়ার্স কারখানার ভেতরে ১৮২ জন আটকা পড়ার কথা জানা যায়। পরে পুলিশ তাদের মৃত ঘোষণা করে। কারখানা দুটি দুই বছরের বেশি সময় ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে এবং উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রায় সাত হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়েছেন।
গাজী পাইপ ও ডোর কারখানার সাবেক শ্রমিক জামিলা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কারখানাটি বন্ধ হওয়ার আগে আমি এবং আমার স্বামী পাইপ সেকশনে কাজ করতাম। কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমরা দীর্ঘদিন বেকার ছিলাম। পরে অন্য একটি গার্মেন্টস কারখানায় আমার স্বামী চাকরি পেয়েছে। কিন্তু আমি আর কোথাও চাকরিতে যাইনি। আমার ছেলে অটোরিকশা চালিয়ে উপার্জন করে। গাজী গ্রুপের কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমার মতো অনেকেই বেকার হয়ে গেছেন।’
কারখানায় হামলার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গোলাম দস্তগীর গাজী আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে এলাকার উত্তেজিত লোকজন ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী লোকজন এ কাজ করেছে। পাশাপাশি গাজীর লোকজন অনেকের জায়গাজমি দখল করেছে। এসব কারণেও হামলা হয়েছে।’
এ বিষয়ে জানতে গাজী টায়ার্সের নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানান।
সরকারি হিসাবে বন্ধ ৪৬ কারখানা
জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দা ও জ্বালানি সংকটেও শিল্পকারখানায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে নিবন্ধিত আরএমজি কারখানা রয়েছে ৫৭২টি এবং নন-আরএমজি কারখানা ২ হাজার ২৪৪টি। এ ছাড়া নিবন্ধিত দোকান ১ হাজার ৫৮৫টি ও প্রতিষ্ঠান ২৬৫টি। অনিবন্ধিত আরএমজি কারখানা ১২টি, নন-আরএমজি ৭২টি, দোকান ৩১ হাজার ১৬৯টি এবং প্রতিষ্ঠান ১০২টি। অধিদফতরের হিসাবমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের আওতাধীন ৪৬টি কারখানা বন্ধ হয়েছে।
এমন তথ্য জানিয়েছেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের নারায়ণগঞ্জ জেলার উপমহাপরিদর্শক রাজীব চন্দ্র ঘোষ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের আওতাধীন কারখানার মধ্যে ৪৬টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। গত দুই বছরে নানা কারণে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে।’
গ্যাস সংকটে ৩০০ কারখানা বন্ধের দাবি
গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। গত ২২ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, ‘গ্যাস সংকটে দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৩০০ কারখানা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রফতানি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে সব কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা উৎপাদন করতে পারছি না, শ্রমিকের বেতন দিতে পারছি না। আমাদের দেড় থেকে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরই মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। এই গ্যাস সংকটকালে প্রায় ৩০০ কারখানা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এর মধ্যে কিছু সচল হয়েছে; বাকিগুলো বন্ধ আছে।’
১১০টি কারখানা বন্ধ বলছে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন
তবে কারখানা বন্ধের সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাবের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি গার্মেন্টস ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এবং শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) নারায়ণগঞ্জ জেলার সমন্বয়ক হাফিজুল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্যাস বা জ্বালানি সংকটের কারণে ৩০০টি কারখানা বন্ধের যে তথ্য বিকেএমইএ দিয়েছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। আমাদের তথ্য অনুযায়ী এ সংখ্যা আরও কম। তবে গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন অনেকাংশে কমেছে।’
জুলাই আন্দোলনের পর থেকে ১১০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে দাবি করে হাফিজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১১০টির অধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়েছেন। এসব বেকার শ্রমিকের অনেকে বিকল্প পেশা বেছে নিয়েছেন, আবার অনেকে এখনও বেকার রয়েছেন। এ নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে গাজী গ্রুপের দুটি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি কারখানা একই কারণে বন্ধ হয়েছে। তবে সেসব প্রতিষ্ঠানের নাম সেভাবে প্রকাশ্যে আসেনি। যেহেতু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে, সে কারণে আমরা সেভাবে এসব বিষয় প্রকাশ করতে চাই না। কারণ একটি কারখানা বন্ধের সঙ্গে হাজার হাজার শ্রমিকের রোজগারের বিষয় জড়িত।’
কারখানা বন্ধের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্যের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।