সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের শিল্পকারখানা ও আবাসিক এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। এতে শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রমে কিছুটা গতি ফিরেছে এবং আবাসিক এলাকায়ও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। সংকট কাটাতে গ্যাসের সরবরাহ আরও বাড়াতে হবে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সাভার আঞ্চলিক কার্যালয় ও ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সরেজমিনে সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখা যায়, গত কয়েক দিনের তুলনায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ২০০ কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানার বয়লার ও আয়রন সেকশন চালু রয়েছে, এমন কারখানাগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। তবে সংকট এখনও কাটেনি। স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য গ্যাসের চাপ ১০ থেকে ১৫ পিএসআই থাকা প্রয়োজন। কিন্তু গত কয়েক দিন কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে এসেছিল। তবে বুধবার থেকে ২ থেকে ৩ পিএসআই পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সকালে সাভারের রেডিও কলোনি, হেমায়েতপুর এবং আশুলিয়ার জামগড়া, কাঠগড়া, জিরাবো, নরসিংহপুর, বেরুন, শিমুলতলা, পলাশবাড়ী, নিশ্চিন্তপুর, বাইপাইল ও জিরানী এলাকার বিভিন্ন কারখানা ঘুরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
সাভারের একটি পোশাক কারখানার পরিচালক মরতুজ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত কয়েক দিন বয়লার ও আয়রন চালাতে পারিনি। তবে বুধবার থেকে গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। আজ কিছু কাজ করা যাচ্ছে। যদিও এই সরবরাহ অপ্রতুল। আরও বাড়াতে হবে।’
ধামরাইয়ের একটি পোশাক কারখানার জেনারেল ম্যানেজার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘যে পরিমাণ বেড়েছে, তাতে স্বল্প কাজ করা যাচ্ছে। তবে একেবারে কম হওয়ার চেয়ে এটাও মন্দের ভালো।’
আবাসিক এলাকাতেও বেড়েছে গ্যাসের চাপ
শিল্পকারখানার পাশাপাশি আবাসিক এলাকাতেও গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়েছে। সাভারের রেডিও কলোনি এলাকার বাসিন্দা ফেরদৌসি সুলতানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রায় দুই মাস কোনও গ্যাসই ছিল না। তবে এখন কিছুটা আসছে। কিন্তু যা আসছে, তাতেও রান্না হচ্ছে না। গ্যাসের চাপ খুবই কম।’
গ্যাসের সংকটের কারণে অনেক বাসিন্দা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। সাভার পৌরসভার কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দিন কিংবা রাত—কোনও সময়ই গ্যাস পাচ্ছি না। তাই সিলিন্ডার এনে তা দিয়েই রান্না করছি।’
তিতাস গ্যাসের আশুলিয়া জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রকৌশলী আবু ছালেহ মুহাম্মদ খাদেমুদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বুধবার থেকেই পরিস্থিতি কিছুটার উন্নতি হয়েছে। শূন্য থেকে এখন সরবরাহ ২-৩ পিএসআই পর্যন্ত আসছে। আগামী দিনগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে বলে আশা করছি।’
সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-১, ঢাকার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে বলে জানতে পেরেছি। আর গ্যাস সংকটের কারণে কোনও কারখানা কাজ বন্ধ বা সমস্যা রয়েছে, এমন তথ্য নেই।’
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্যাসের সরবরাহের উন্নতি হয়েছে। মোটামুটি আগের অবস্থায় ফিরছে। ফলে যে অচলাবস্থা ছিল, তা কেটে গেছে।’
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সে অনুযায়ী পরিস্থিতি আরও উন্নতি হবে, এমনটাই প্রত্যাশা করছি। বিশেষত, শিল্প বাঁচাতে কারখানাগুলোতে সরবরাহ বাড়ানোর কোনও বিকল্প নেই।’
বিদ্যুতের পরিস্থিতি
গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানা গেছে। পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার দুপুর ২টায় সাভার গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৪২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৩৭ মেগাওয়াট। সেখানে লোডশেডিং ছিল ৫ মেগাওয়াট।
নবীনগর গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৯০ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ছিল ৭৮ মেগাওয়াট। সেখানে লোডশেডিং ছিল ১২ মেগাওয়াট।
তবে ধামরাই গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ উভয়ই ছিল ১১ মেগাওয়াট। মির্জাপুর গ্রিডে চাহিদা ও সরবরাহ ছিল ৩ মেগাওয়াট করে। এনএলডিসির হিসাবে, এই দুই গ্রিডে কোনও লোডশেডিং ছিল না।
এ ছাড়া কবিরপুর গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ ছিল ২১০ মেগাওয়াট। ফলে সেখানে ঘাটতি ছিল ৪০ মেগাওয়াট।
কড্ডা গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১১০ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ছিল ৭৫ মেগাওয়াট। সেখানে এনএলডিসির লোডশেডিং ছিল ১৫ মেগাওয়াট। বাস ওভারলোডের কারণে ফিডার শাটডাউন (এফ/এস) ছিল ২০ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সামিট পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে সরবরাহ ছিল ৯ মেগাওয়াট। ইউনাইটেড পাওয়ার থেকে সরবরাহ ছিল শূন্য মেগাওয়াট। বুধবার ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর আওতাধীন এলাকায় মোট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫১৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে মোট সরবরাহ ছিল ৪২৩ মেগাওয়াট। মোট এনএলডিসি লোডশেডিং ছিল ৭২ মেগাওয়াট এবং ওভারলোড ছিল ২০ মেগাওয়াট।
ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. আক্তারুজ্জামান লস্কর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত কয়েক দিনের তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ বেড়েছে। পরিস্থিতি আরও উন্নতি হবে। গুরুত্ব অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা।’