রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ এক পরিবারের চার জনকে হত্যার ঘটনায় নতুন সূত্র পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা ডিবি পুলিশ। এজন্য গ্রেফতার দুই আসামি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় তাদের ঢাকার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিনাত আলী কারাগার থেকে দুই আসামিকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী।
ডিবি পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আদালতের অনুমতি নিয়ে আসামিদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সোমবার তাদের সিআইডির দফতরে নিয়ে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পর গণপতি চক্রবর্তীর বাসা থেকে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের সংগ্রহ করা ৩৬ ধরনের আলামতও রবিবার রাতে ঢাকায় সিআইডির দফতরে পাঠানো হয়েছে। এসব আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হবে।
সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষায় ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা অন্তত তিনটি আলামতে পুরুষের ডিএনএ পাওয়ার তথ্য এসেছে। সিগারেটের ফিল্টার, কামড় দেওয়া শসার অংশবিশেষ ও খেজুরের বিচিতে পাওয়া ডিএনএ কার, তা শনাক্ত করা হয়নি। এসব ডিএনএ নিহত গণপতি চক্রবর্তী এবং দুই আসামি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।
রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী রবিবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘সিআইডির ফরেনসিক টিম কয়েকটি আলামত থেকে পুরুষের ডিএনএ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে আরও আলামত পরীক্ষা করা হতে পারে। আসামিদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে তা সিআইডিতে পাঠানো হবে।’
এদিকে, ময়নাতদন্তের সময় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীর থেকে পাওয়া নমুনা নিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে বিভিন্ন দাবি উঠেছে। ওই নমুনার সঙ্গে আসামিদের ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হবে বলে জানা গেছে। তবে মা-মেয়েকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে যে অভিযোগ উঠেছিল, সেটি পুলিশ বা ফরেনসিক পরীক্ষায় এখনও নিশ্চিত হয়নি। এর আগে পুলিশের পক্ষ থেকে মা-মেয়েকে ধর্ষণের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছিল। এবারের পরীক্ষায় সেটিও নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ফরেনসিক পরীক্ষায় কোনও আলামতের ডিএনএর সঙ্গে আসামিদের ডিএনএ মিলে গেলে হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যাবে। আর ডিএনএ না মিললে ঘটনাস্থলে অন্য কারও উপস্থিতি ছিল কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাবে।
গত ২১ আগস্ট দিবাগত রাতে মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, চার জনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। পরে প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেফতার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ওই দুই আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দুই আসামির সম্পৃক্ততা এবং পুলিশের দেওয়া হত্যার কারণ নিয়ে নিহতের স্বজনসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, হত্যার প্রকৃত কারণ কী এবং ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামতের সঙ্গে আসামিদের ডিএনএর মিল রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এবার রংপুরের আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে ফরেনসিক পরীক্ষা ও ডিএনএ প্রতিবেদনের দিকে এখন তাকিয়ে রয়েছে তদন্তকারী সংস্থা।