সাভারের রেডিও কলোনি এলাকায় গত ২১ সেপ্টেম্বর সড়কের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা একটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলায় বাসের মালিক, সাংবাদিকসহ ৪০ জনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। গত সোমবার রাতে সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্বাস উদ্দিন বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
ঘটনার দিন সংবাদমাধ্যমে সাভার থানার ওসি বলেছিলেন, বাসটি দীর্ঘ দিন ধরে সেখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। মাদকসেবীরা সেখানে আড্ডা দিতো। এর মধ্যে বাস পোড়ানোর অভিযোগে সোমবার যে মামলা করা হয়েছে, তাতে বাসটির মালিককে করা হয়েছে মামলার ২ নম্বর আসামি। এ ছাড়া মামলায় ১৮ নম্বর আসামি করা হয়েছে ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মো. কামরুজ্জামানকে। এতে তার পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে আওয়ামী লীগের সাভার উপজেলা কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে। তবে ওই সাংবাদিকের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সাভারে থাকেন না। সপরিবারে ঢাকায় বসবাস করেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২১ সেপ্টেম্বর রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে সাভার মডেল থানার পুলিশের একটি দল রাতের ডিউটিতে থাকা অবস্থায় স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে খবর পায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে আল মুসলিম গার্মেন্টসের বিপরীতে রেডিও কলোনি স্টাফ কোয়ার্টারের গেটের প্রায় ১০০ গজ পশ্চিমে আওয়ামী লীগের লোকজন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে পেট্রোলবোমাসহ একটি বাসে আগুন দেওয়ার জন্য জড়ো হয়েছেন।
খবর পেয়ে পুলিশ রাত ২টা ৫০ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পায়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে ৬০-৭০ জন ব্যক্তি একটি বাসে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে আগুন দিচ্ছেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাদের অধিকাংশ মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাসে এবং অন্যরা আশপাশের বিভিন্ন সড়ক দিয়ে পালিয়ে যান। এ সময় পুলিশ কয়েকজনকে চিনতে সক্ষম হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলে তাদের সহযোগিতায় আগুন নেভানো হয়। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তিনি আসামিদের শনাক্ত করেন।
এজহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদে ও গোপন সূত্রে জানা যায়, আসামি হাবিবুর রহমান অসৎ উদ্দেশ্যে তার সাভার পরিবহন বাসটির ইঞ্জিন ও গিয়ার বক্স ছাড়া রাস্তার পাশে ফুটপাতে পার্কিং করে রেখেছিলেন। মুরাদ জং এবং বিরুলিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম মণ্ডলের নির্দেশে, সহায়তায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় হাবিবুর রহমান অন্য আসামিদের জড়ো করে বাসটিতে অগ্নিসংযোগ করেছেন। বাসটির আনুমানিক মূল্য ৮ লাখ টাকা। মামলায় বাসটির মালিক হাবিবুর রহমানকে ২ নম্বর আসামি করা হয়।
এজাহারে তাকে আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুরাদ জংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, রাত ৩টা ৩০ মিনিটের দিকে স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত জব্দ করে তালিকা করা হয়। পরদিন অভিযান চালিয়ে সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের আকরাইন বাজার থেকে মামলার ১ নম্বর আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি সাভার সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল রানা প্রাথমিকভাবে বাসে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে আগুন দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। ঘটনায় জড়িত পলাতক আসামিদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করেন তিনি। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
মামলায় তিন জন সাক্ষীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম সাক্ষী হিসেবে আকাশ নামে এক ব্যক্তির নাম লেখা হয়েছে। যুক্ত করা হয়েছে একটি ফোন নম্বর। তবে সেই ফোন নম্বরে কল দিয়ে আকাশকে পাওয়া যায়নি। ফোনটি ধরেন আরিফুল ইসলাম ঝলক নামে এক ব্যক্তি। তিনি নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক পরিচয় দেন। মামলায় উল্লেখ করা ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমি সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম না।’
পরবর্তীতে আকাশের বিষয়ে জানতে চাইলে ঝলক বলেন, ‘আকাশ ছাত্রদলের সাভার থানা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তবে তার ব্যক্তিগত কোনও ফোন নম্বর নেই। পরবর্তীতে তিনি তার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবেন বলে জানান। আকাশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন কিনা এ বিষয়ে তার কিছু জানা নেই বলেও জানান। তার নম্বর কীভাবে আকাশের নামের সঙ্গে যুক্ত হলো এই বিষয়ে ঝলক বলেন, ‘আকাশ আমার সঙ্গেই থাকে বেশি, তাই দিতে পারে পুলিশ।’
মামলার অপর সাক্ষী মানিকের ফোন নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি কল ধরেননি। আর তৃতীয় সাক্ষী পুলিশের একজন কনস্টেবল।
এজাহারে উল্লেখ করা মোবাইল নম্বরে কল করলে মামলার বাদী আব্বাস উদ্দিন রিসিভ করেন। বাস মালিককে কেন আসামি করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘটনায় তারও সংশ্লিষ্টতা আছে।’
ঘটনার দিন সংবাদমাধ্যমে সাভার থানার ওসি বলেছিলেন, “বাসটি দীর্ঘদিন ধরে সেখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল; সেখানে মাদকসেবীরা আড্ডা দিতো” তাহলে কীভাবে সেদিন রাতে ঘটনাস্থলে জনতা জড়ো হয়েছিল বলে এজাহারে বলা হয়েছে; জানতে চাইলে ওসির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন আব্বাস উদ্দিন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, ‘বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে ৪০ জনের নাম উল্লেখসহ ২০-৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে থানায় মামলা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে কেউ ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকলে তিনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। তদন্তের পর জড়িত থাকার প্রমাণ না পাওয়া গেলে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।’
এদিকে মামলায় আসামি করায় হতভম্ব সাংবাদিক কামরুজ্জামান খান। তিনি বলেন, ‘যেদিন ওই বাসে আগুন লাগে, সেদিন সংবাদমাধ্যমে ওসি বক্তব্য দিয়েছিলেন, “গাড়িটি ২৬ দিন ধরে বিকল পড়ে ছিল। মাদকসেবীরা আগুন দিয়েছে।” এখন সেই ঘটনায় করা মামলায় আমাকে আসামি হয়েছে। আমি সাভারে থাকি না। আমি শতভাগ পেশাদার। সাংবাদিকদের সংগঠন করি, ডিআরইউয়ের স্থায়ী সদস্য ও ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সাবেক সভাপতি। মামলায় নাম দেখে আমি হতভম্ব এবং আশ্চর্য হয়েছি। আমি সপরিবারে ঢাকাতে থাকি। আমার ধারণা কেউ শত্রুতা করে এই মামলায় আমাকে যুক্ত করেছে।’
গাড়ির মালিককে আসামি করার বিষয়ে ওসি সাইফুল আলম বলেন, ‘ইঞ্জিন সরিয়ে ফেলে গাড়ির মালিক গত ২৬ দিন ধরে গাড়িটি ওখানে ফেলে রেখেছিল। আমরা তাকে একাধিকবার গাড়িটি সরাতে বলেছি। কিন্তু সরায়নি। আমরা ধারণা করছি, পূর্ব পরিকল্পিতভাবে নাশকতার পরিকল্পনা নিয়েই গাড়িটা ওখানে রাখা হয়েছে।’
ঘটনার দিন সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন মাদকসেবীরা আড্ডা দিতো, তারাই আগুন দিয়েছে; তাহলে পরে কীভাবে সেখানে লোকজন জড়ো হয়েছিল এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘পরবর্তীতে আমরা জানতে পেরেছি, সেখানে লোকজন এসে জড়ো হয়েছিল।’
সাংবাদিককে মামলার আসামি করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি দেখবো। এরই মধ্যে তার সঙ্গে কথা হয়েছে। কেউ জড়িত না থাকলে তাকে বাদ দেওয়া হবে।’