ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪ গ্রাহকের টাকা তোলার ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের নির্দেশ

ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির চার আমানতকারী যাতে তাদের সঞ্চয়ী হিসাব থেকে টাকা তুলতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। জমা টাকা ফেরত চেয়ে বারবার অনুরোধ করেও ব্যর্থ হয়ে ওই গ্রাহকেরা রিট করলে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিচারক ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারক মো. আলী রেজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের অ্যানেক্স কোর্ট নম্বর ২৯-এর বেঞ্চ এই অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন। ‘লাকী আক্তার ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য’ শিরোনামের রিট পিটিশন নম্বর ১৩৬৬৮/২০২৬-এর শুনানি নিয়ে এই নির্দেশ দেওয়া হয়, যা দিনের কার্যতালিকায় ১৭৪ নম্বর ক্রমিকে ছিল।

আদেশের পাশাপাশি আদালত রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন—আবেদনকারীদের হিসাবে বৈধভাবে জমা থাকা টাকা তুলতে দেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না। এই রুলে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসিকে বিবাদী করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশে বলা হয়েছে, আবেদনকারীদের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এর মহাব্যবস্থাপক, টেকনোলজি রিস্ক অ্যান্ড ডিজিটাল ব্যাংকিং সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট এবং কাস্টমার ইন্টারেস্ট প্রোটেকশন সেন্টারের (সিআইপিসি) পরিচালকের মাধ্যমে এই পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংক যাতে চার আবেদনকারীর জমা টাকা তোলার সুযোগ দেয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাদের দেওয়া হয়েছে। 

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মারুফ উল আবেদ আদালতে আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন এবং একই দিন দেওয়া লইয়ার্স সনদে আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, রিট আবেদনকারী চার জনই ন্যাশনাল ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবধারী। তাদের মধ্যে লাকী আক্তারের হিসাব টাঙ্গাইলের মির্জাপুর এসএমই কৃষি শাখায়, নাসিমা বেগম ও মোছা. সাথী বেগমের হিসাব মির্জাপুর শাখায় এবং মো. শামীম আহমেদের হিসাব ময়মনসিংহের ভালুকা শাখায়। ২০ সেপ্টেম্বর পাওয়ার অব অ্যাটর্নি অনুযায়ী শামীম আহমেদ অন্য আবেদনকারীদের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ১৭ সেপ্টেম্বর। ওই দিন চার গ্রাহক নিজ নিজ হিসাবের চেক ভাঙাতে স্থানীয় শাখায় যান, কিন্তু শাখা কর্মকর্তারা কোনও বৈধ বা সন্তোষজনক কারণ ছাড়াই চেক গ্রহণ ও টাকা পরিশোধ করতে অস্বীকৃতি জানান। নাসিমা বেগম ৩০ হাজার টাকার চেক জমা দিয়েও টাকা তুলতে পারেননি। গ্রাহকদের হিসাবগুলো বৈধ, সচল এবং তাতে পর্যাপ্ত টাকা থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকের কর্মীরা টাকা আটকে রাখেন এবং কোনও আইনানুগ আদেশ বা লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান করেননি।

ব্যাংক থেকে কোনও প্রতিকার না পেয়ে গ্রাহকেরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাস্টমার ইন্টারেস্ট প্রোটেকশন সেন্টার (সিআইপিসি) এবং ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টে (এফআইসিএসডি) ই-মেইলে অভিযোগ জানালেও ফল পাননি। 

আবেদনকারীরা নিজেদের সাধারণ আয়ের মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে জানান, জীবনধারণ, চিকিৎসা ও পড়াশোনার দৈনন্দিন খরচের জন্য তারা এই সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরশীল। কোনও আইনি ভিত্তি ছাড়া আমানত আটকে রাখা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), অনুচ্ছেদ ৩১ (আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার), অনুচ্ছেদ ৩২ (জীবন ও জীবিকার অধিকার) এবং অনুচ্ছেদ ৪২ (সম্পত্তির অধিকার)-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। আমানতকারীরা বাড়তি কোনও সুবিধা চান না, কেবল আইন অনুযায়ী নিজেদের জমানো টাকা ফেরত চান। 

আবেদনকারীরা জানান, তফসিলি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক হিসেবে এ জাতীয় অভিযোগ নিষ্পত্তি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি দায়িত্ব, যা পালনে ব্যর্থতা সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে চ্যালেঞ্জযোগ্য।

এই আদেশ এমন সময়ে এলো যখন ন্যাশনাল ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে তারল্যসংকটে ভুগছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঈদের আগে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে হিমশিম খেলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১ হাজার কোটি টাকার জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও ব্যাংকের সম্পদের মানের মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৩০২ কোটি টাকায়, যা তাদের মোট বিতরণ করা ঋণের ৫৬.৪৪ শতাংশ। 

বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ব্যাংকটির শাখায় টাকা তুলতে এসে গ্রাহকেরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন এবং এটিএম বুথেও প্রায়ই টাকা থাকছে না। ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক উক্ত পত্রিকায় স্বীকার করেছেন যে, জরুরি সহায়তার খবরে আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে পরিকল্পিতভাবে সীমিত আকারে টাকা দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।