এক শাড়ির দাম ২ লাখ টাকা, ব্যাগে করে এনে বিক্রি হয় হাটে

মিহি জমিনে সূক্ষ্ম নকশার কাজ, ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ির এমন সৌন্দর্য মুগ্ধ করে দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের। সেই চাহিদাকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জামদানি পল্লিতে তৈরি হচ্ছে নানা রঙ ও নকশার শাড়ি। তবে বৈশ্বিক যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাবে জামদানি শাড়ির বিক্রি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ী ও কারিগররা।

ব্যবসায়ী ও কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মান ও নকশাভেদে প্রতিটি জামদানি শাড়ি ২ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। সুতার কাউন্ট যত বেশি, শাড়ির দামও তত বেশি। কাউন্টের ওপর নির্ভর করে শাড়ি তৈরিতে প্রয়োজনীয় সময়ও কম-বেশি হয়।

জামদানির উল্লেখযোগ্য নকশার মধ্যে রয়েছে ময়ূরপ্যাঁচপাড়, বাঘনলি, কলমিলতা, চন্দপাড়, ঝুমকা, তেরছা, জলপাড়, পান্নাহাজার, করোলা, দুবলাজাল, সাবুরগা, বলিহার, শাপলাফুল ও আঙ্গুরলতা।

৩ হাজারের বেশি তাঁতশিল্পী

জামদানি বিসিক শিল্পনগরী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামে ২০ একর জমির ওপর প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলে।

জামদানি শাড়ি

জামদানি পল্লিতে কারুশিল্পীদের জন্য রয়েছে ৪০৭টি প্লট। প্রতিটি প্লটে রয়েছে কমপক্ষে চারটি করে তাঁত। বর্তমানে এ পল্লিতে প্রায় ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ তাঁতশিল্পী কাজ করছেন। জামদানি শাড়ির পাশাপাশি তারা পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস ও টু-পিসও তৈরি করছেন। উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতাদের মধ্যে জামদানি শাড়ির চাহিদা বেশি।

তাঁতিদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে বিসিক বিভিন্ন সময় জামদানি মেলার আয়োজন করে। দেশের পাশাপাশি ভারতের অরবিন্দ ইনস্টিটিউট ও দিল্লির হরিয়ানায় অনুষ্ঠিত সুরাজকুন্ড মেলায় বিসিকের পৃষ্ঠপোষকতায় উদ্যোক্তারা অংশ নেন। এসব মেলায় বাংলাদেশের জামদানি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে এবং ভালো বিক্রি হয়।

এ ছাড়া জামদানিপল্লিতে প্রতি শুক্রবার বসে জামদানি হাট। ছোট উদ্যোক্তারা সেখানে সরাসরি তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সুযোগ পান।

বিক্রি নেমেছে অর্ধেকে

ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনার পর এবার আবারও জামদানি বিক্রিতে বড় ধাক্কা এসেছে। বৈশ্বিক যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং সন্ধ্যার পর বিপণিবিতান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে বিক্রিতে। তাদের দাবি, এসব কারণে জামদানি শাড়ির বিক্রি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমেছে।

জামদানি পল্লির সোহাগ জামদানি হাউজের মালিক ও কারিগর নজরুল ইসলাম বলেন, ‘জামদানি শাড়ি বেচাবিক্রির অবস্থা ভালো না। আগের তুলনায় বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকার শাড়ি বিক্রি হতো, এখন তা অর্ধেকের নিচে অর্থাৎ ৪-৫ লাখে বিক্রি নেমে এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায় টিকে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘আমার কারখানায় ৩৫ জন কারিগর কাজ করেন। প্রতি মাসে তারা অর্ধশত জামদানি পণ্য তৈরি করেন। তবে আগের তুলনায় বেচাবিক্রি কম হওয়ায় সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।’

জামদানি শাড়ি। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

তামিম জামদানি হাউসের মালিক ও কারিগর আল আমিন বলেন, ‘প্রতি মাসে গড়ে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার জামদানি বিক্রি হতো। কিন্তু এখন নানা সংকটের কারণে বিক্রি কমে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকায় নেমেছে। আমার কারখানায় ৫০ জন কারিগর প্রতি মাসে ৬০-৭০টি শাড়ি তৈরি করেন। এখন বিক্রি কমে যাওয়ায় তাদের মজুরি দিতে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সন্ধ্যার পর বিপণিবিতান বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, অথচ ওই সময়ে জামদানি শাড়ির ক্রেতা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ ছাড়া বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাব ও দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে জামদানি পণ্যের বিক্রি কমেছে। আমার কারখানায় ১০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা মূল্যের জামদানি শাড়ি তৈরি করা হয়।’

জামদানি কারিগর আব্দুল কাদির বলেন, ‘বাজারে জামদানি শাড়ি বেচাবিক্রির পরিমাণ কমেছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের অর্ডার কমে যাবে, আর তাতে আশানুরূপ আয় করা সম্ভব হবে না। কারণ অর্ডার কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের আয় কমে যায়। ফলে এটা বেশ দুশ্চিন্তার বিষয়।’

ঈদে শত কোটি টাকার জামদানি

রূপগঞ্জ জামদানি বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদকে কেন্দ্র করে জামদানি তৈরি করেন কারিগর ও মালিকরা। সারা বছর জামদানি তৈরি ও বিক্রি হলেও ঈদের মৌসুমে সবচেয়ে বেশি বেচাবিক্রি হয়। প্রতি ঈদের মৌসুমে প্রায় ১০০ কোটি টাকার জামদানি বেচাকেনা হয়ে থাকে। অন্যান্য মাসে গড়ে ৪০-৫০ কোটি টাকার জামদানি বিক্রি হয়। প্রতি সপ্তাহে একদিন এখানে জামদানি পণ্য বিক্রির হাট বসে। সেখানে ২০-২৫ লাখ টাকার জামদানি বিক্রি হয়।’

হাটে শাড়ি বিক্রি করতে এসেছেন কারিগররা। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

জামদানি পণ্যের বিক্রি কমার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মূলত জামদানি বিক্রি কিছুটা কমেছে। বিগত ঈদুল ফিতরেও জামদানি ব্যবসায়ীরা আশানুরূপ লাভ করতে পারেননি বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তবে পণ্য বেচাবিক্রির সঙ্গে দেশের অর্থনীতির সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাছাড়া জামদানি পণ্য তুলনামূলক দামি হওয়ায় সব শ্রেণির ক্রেতাদের পক্ষে তা কেনা সম্ভব হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিসিক পল্লির দোকানের পাশাপাশি অনলাইনেও পণ্য বিক্রির সুযোগ রয়েছে। আমাদের বিসিক পল্লির উদ্যোক্তাদের অনলাইনে পণ্য বিক্রির সুযোগ রয়েছে। আমরা সব সময় জামদানি কারিগরদের উন্নয়নে কাজ করে আসছি।’

দেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানি শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাজারো কারিগরের জীবন-জীবিকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু বিক্রিই নয়, এর প্রভাব পড়বে উৎপাদন ও কারিগরদের আয়েও। তাই বাজার সম্প্রসারণ, রফতানি বাড়ানো এবং উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করাই এখন জামদানি শিল্প টিকিয়ে রাখার বড় চ্যালেঞ্জ।