গাজীপুরের শ্রীপুরে বিকাশের এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের টাকা বহনকারী প্রাইভেটকারে গুলি চালিয়ে তিন কোটি টাকা লুটের ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও সেই টাকা উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। শনিবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। এমনকি এখন পর্যন্ত থানায় মামলা করেনি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শ্রীপুর-গোসিংগা সড়কের কর্ণপুর এলাকায় প্রাইভেটকারে গুলি চালিয়ে তিন কোটি টাকা লুটের ঘটনা ঘটেছিল। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের দাবি, গাড়িতে চারটি বস্তায় চার কোটি টাকা ছিল। দুর্বৃত্তরা এর মধ্যে তিনটি বস্তা নিয়ে গেছে। যেখানে তিন কোটি টাকা ছিল।
এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির হিসাব ব্যবস্থাপক হিমেল আহমেদ গুলিবিদ্ধ এবং দুই কর্মী আহত হন। হিমেলকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। টাকা লুটের ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে।
শনিবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। তিনি বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে অবস্থান করেন। এ সময় জেলা পুলিশের একাধিক দল তদন্তে কাজ করছিল।
কাউকে এখনও শনাক্ত করা যায়নি
এ সময় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘তবে মামলা এখনও রেকর্ড হয়নি, প্রক্রিয়াধীন আছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে এখনও শনাক্ত করা যায়নি। আহত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলাসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে পুলিশ। লুট হওয়া টাকা উদ্ধার ও জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’
এত বিপুল পরিমাণ টাকা পরিবহনের বিষয়ে পুলিশকে আগে থেকে জানানো হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘টাকা পরিবহনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে পুলিশকে অবহিত করা উচিত। পুলিশ এ ধরনের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। আমরা আশ্চর্য হয়েছি এ জায়গাটাতে যে এতগুলো টাকা ট্রান্সপোর্ট হলো, পুলিশকে তারা ইনফর্ম করলো না। তারপরে ভিন্ন জেলা নরসিংদী থেকে টাকাগুলো নিয়ে আসলো।’
পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘কর্ণপুর এলাকাটি নিরিবিলি ও জনবসতি কম। এমন একটি সড়ক দিয়ে এত টাকা পরিবহন করা হয়েছে, অথচ পুলিশকে জানানো হয়নি—বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
পুলিশ সুপার বলেন, ‘টাকা সংগ্রহ, পরিবহন, গাড়ি ভাড়া এবং সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের সঙ্গে আহত হিমেল আহমেদ যুক্ত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এজেন্ট মামুনের সঙ্গেও কথা বলেছে পুলিশ। টাকা বহনের জন্য নির্ধারিত পথের পরিবর্তে অন্য পথ ব্যবহার করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। টাকা-পয়সার সঠিক পরিমাণও এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একটি সূত্র জানায়, জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি দল লোন শাখার ক্রেডিট ম্যানেজার ফাহাদ হোসেনকে নিয়ে শনিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। পরে যে পথে টাকা বহনকারী প্রাইভেটকারটি এসেছিল, সেই পথ ধরে নরসিংদীর দিকেও যাচ্ছেন গোয়েন্দা দলের সদস্যরা।
পুলিশের ধারণা, টাকা পরিবহনের পথ, সময় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করার কথা জানায়নি পুলিশ।
প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম জানান, নরসিংদী থেকে টাকা সংগ্রহ করে তার প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা প্রাইভেটকারে করে শ্রীপুর ও ভালুকার দিকে ফিরছিলেন। গাড়িতে চারটি বস্তায় মোট চার কোটি টাকা ছিল।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গোসিংগা-শ্রীপুর সড়কের কর্ণপুর এলাকায় পৌঁছালে পেছন দিক থেকে ১০ থেকে ১২টি মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা প্রাইভেটকারটি ঘিরে ধরে। তারা গাড়িটির গতিরোধ করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরে কর্মীদের মারধর ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। একপর্যায়ে প্রাইভেটকারের পেছনের বক্সে থাকা চার বস্তা টাকার মধ্যে তিন বস্তা নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। তবে লুট হওয়া তিন বস্তায় ঠিক কত টাকা ছিল, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেননি রফিকুল ইসলাম।
গুলিবিদ্ধ ম্যানেজারসহ আহত তিন জন
ঘটনায় আহত ব্যক্তিরা হলেন শ্রীপুর পৌরসভার চন্নাপাড়া এলাকার মোহাম্মদ জসিমের ছেলে হিমেল আহমেদ (৩৫), বেড়াইদেরচালা এলাকার বুলবুল আহমেদের ছেলে ফাহাদ হোসেন (৩৫) এবং একই এলাকার এসকিউ সোয়েটার কারখানাসংলগ্ন এলাকার মোহাম্মদ জামানের ছেলে রিফাত (৩০)। তাদের মধ্যে হিমেল শ্রীপুর এলাকার হিসাব বিভাগের ব্যবস্থাপক, ফাহাদ লোন শাখার ক্রেডিট ম্যানেজার এবং রিফাত শ্রীপুর-মাওনা এলাকার সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত। প্রাইভেটকারের চালক লাল মিয়াও আহত হয়েছেন। তিনি শ্রীপুরের কেওয়া পশ্চিম খণ্ড এলাকার মৃত ফালু মিয়ার ছেলে।
শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক অনিক সরকার বলেন, ‘শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিন জনকে হাসপাতালে আনা হয়। হিমেল আহমেদের পেটের ডান পাশে গভীর ক্ষত ছিল, যা গুলির আঘাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। অন্য দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’