পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিলেছে এক হাজার ৪৩ ভরি স্বর্ণ, ১২‌ কে‌জি রুপা

প্রায় সাড়ে ছয় বছর পর কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্স খুলে পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা। এর মধ্যে রয়েছে ১২ কেজি ১৭৪ গ্রাম স্বর্ণ (এক হাজার ৪৩ ভরি), ১২ কেজি ৬৯০ গ্রাম রূপার অলঙ্কার। তবে এখনও বৈদেশিক মুদ্রা গণনার কাজ চলছে। 

সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক মো. এরশাদুল আহমেদ। সাড়ে ছয় বছর পর সোমবার সকাল ৯টা থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারিতে সংরক্ষিত এসব মূল্যবান সামগ্রী গণনার জন্য বের করা হয়।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ৯টি মাঝারি আকারের কনটেইনার ও ছয়টি সিলগালা খাম খুলে গণনার কার্যক্রম শুরু করা হয়। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) ১০ জন কারিগর স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কারের মান অনুযায়ী পৃথক করা এবং ওজন নির্ধারণের কাজ করেন।

গণনা শেষে সন্ধ্যা ৬টায় চূড়ান্ত পরিমাণ ঘোষণা করেন কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক মো. এরশাদুল আহমেদ। স্বর্ণ-রুপার ওজন পরিমাপ ও বৈদেশিক মুদ্রা গণনার কাজে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের তিন জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ১০ জন পুলিশ সদস্য ও ছয় জন এসআরবি সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন।

এর মধ্যে রয়েছে ১২ কেজি ১৭৪ গ্রাম স্বর্ণ

পরিমাপ ও গণনা কার্যক্রমে জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদ এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল হাসান মারুফসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

দানবাক্স খোলা কমিটি সূত্রে জানা যায়, সকাল ৯টায় খোলা হয় ট্রেজারির দরজা। এরপর সেই রত্নভান্ডারের নয়টি কনটেইনারে ভর্তি ছিল স্বর্ণ-রুপা, ছয়টি সিলগালা খামে ছিল বিদেশি মুদ্রা। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এগুলো নিয়ে যাওয়া হয় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে। এরপর শুরু হয় বাছাই ও পরিমাপ এবং গণনার কাজ। এ কাজের তত্ত্বাবধান করেন জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন। পরিমাপ ও মুদ্রা গণনার কাজ করেন জেলা প্রশাসন ও পাগলা মসজিদের কর্মীরা। কাজ করেন রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তারাও। এসব স্বর্ণ ও রুপার বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিলামে বিক্রি করা হবে। বৈদেশিক মুদ্রাগুলো ব্যাংকের বিনিময় হার অনুযায়ী নগদায়ন করা হবে।

গণনা কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা রূপালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখার এজিএম মোহাম্মদ আলী হারেছী বলেন, ‘৩০‌টি দে‌শের বি‌দে‌শি মুদ্রা পাওয়া গেছে। ত‌বে এগু‌লো গণনা করে শেষ করতে আরও সময় লাগ‌বে।’

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পাগলা মসজিদের তহবিলে সব মিলিয়ে জমা আছে ১৩১ কোটি ৮৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮১০ টাকা। পাশাপাশি মসজিদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনুদান হিসেবে এসেছে আরও ৩৯ লাখ ৩২ হাজার ৯০৬ টাকা। 

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পাগলা মসজিদে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভক্ত ও দর্শনার্থীরা নগদ অর্থের পাশাপাশি মানত হিসেবে স্বর্ণ-রুপার অলঙ্কার ও বৈদেশিক মুদ্রা দান করেন। নিয়মিত বিরতিতে দানবাক্স খোলার পর নগদ অর্থ ব্যাংকে জমা দেওয়া হলেও অলঙ্কার ও বিদেশি মুদ্রা সিলগালা করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করা হতো।

জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, ‘অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত নয় সদস্যের উপকমিটির তত্ত্বাবধানে গণনা ও ওজন নির্ধারণের কাজ করা হয়। এ কাজে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, আনসার, ব্যাংক কর্মকর্তা ও স্বর্ণকারেরা সহযোগিতা করেন। অলঙ্কারগুলোর সঠিক ওজন ও মান নির্ধারণের পর বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। বৈদেশিক মুদ্রাগুলো দেশ অনুযায়ী আলাদা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ বিনিময় হার অনুসারে টাকায় রূপান্তর করা হবে।’

১২ কেজি ৬৯০ গ্রাম রূপার অলঙ্কার পাওয়া গেছে

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১১ মার্চ সর্বশেষ পাগলা মসজিদের দানবাক্সে পাওয়া স্বর্ণ, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা গণনা করা হয়েছিল। সে সময় প্রায় তিন বছর ধরে জমা হওয়া ৪২০ ভরি স্বর্ণ ও ১৮৮ ভরি রুপার অলঙ্কার নিলামে বিক্রি করে ১ কোটি ১৫ লাখ ৪ হাজার ১১০ টাকা পাওয়া যায়। অলঙ্কারগুলো বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে বিক্রি করা হয়েছিল। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করে পাওয়া গিয়েছিল ৭০ লাখ টাকা।

জেলা প্রশাসক জানান, ২০২০ সালের মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৮ বার দানবাক্স খোলা হলেও স্বর্ণ, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রার গণনা করা হয়নি। সর্বশেষ গত ২৭ জুন দানবাক্স খুলে ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার টাকা পাওয়া যায়।

বর্তমানে রূপালী ব্যাংকে পাগলা মসজিদের হিসাবে জমা রয়েছে ১৩১ কোটি ৮৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮১০ টাকা। মসজিদের নিজস্ব ওয়েবসাইট চালুর পর অনলাইনে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৩৯ লাখ ৩২ হাজার ১০৬ টাকা অনুদান পাওয়া গেছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

মসজিদ কমিটি সূত্রে জানা যায়, মসজিদের অনুদানের অর্থ দিয়ে মুসল্লিদের সুবিধা বাড়াতে বিভিন্ন উন্নয়নকাজ চলছে। মসজিদ প্রাঙ্গণে তিনটি নতুন নামাজের শেড, বড় পরিসরের অজুখানা এবং নারীদের জন্য পৃথক ওয়াশব্লক নির্মাণে ১ কোটি ১০ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৪ টাকার কাজ চলমান। গত ২৭ সেপ্টেম্বর এ কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। বহিরাগত মুসল্লিদের জন্য পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে।