ছাত্রদল নেতাকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে পিটুনির অভিযোগ

ঢাকার ধামরাইয়ের চৌহাট এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে জিম্মি করে তুলে নিয়ে মাহফুজুর রহমান ইমন (২৮) নামে এক ছাত্রদল নেতাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বালিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। 

ভুক্তভোগী নেতার দাবি, ৭ হত্যা মামলাসহ ৩৩ মামলার আসামি সম্প্রতি জামিনে আসা চৌহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মোকসেদ ও তার অনুসারীরা এই হামলা চালিয়েছে।

যদিও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের স্ত্রীর ভাষ্য, মাদক সংক্রান্ত কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। যদিও ভুক্তভোগীর ভাষ্য, সম্প্রতি মাদকসহ কয়েকজনকে আটক করেন মোকসেদ। তবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি, মাদকও ধ্বংস করা হয়নি। সেই মাদক দিয়েই তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগী মাহফুজুর রহমান ইমন ধামরাইয়ের চৌহাট ইউনিয়নের চৌহাট এলাকার বাসিন্দা। তিনি ধামরাই উপজেলা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক। অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম মোকসেদও একই এলাকার বাসিন্দা। তিনি সেনা সদস্যকে নৃশংস হত্যাসহ ৭টি হত্যা মামলা ও মোট ৩৩টি মামলার আসামি। সম্প্রতি তিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে এলাকায় ফিরে আসেন।

প্রত্যক্ষদর্শী, উভয়পক্ষ ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার সকালের দিকে ব্যক্তিগত কাজে ভাড়া করা প্রাইভেটকারে করে চৌহাট থেকে ধামরাইয়ের উদ্দেশে রওনা হন ইমন। একপর্যায়ে বালিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে ৮-১০টি মোটরসাইকেল নিয়ে প্রায় ২০-২৫ জন ব্যক্তি তার গাড়ির পথরোধ করে। জিম্মি করে তাকে বাজারের আরেক পাশে নিয়ে যায়। এ সময় তিনি গাড়ি দিয়ে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোকসেদকে চাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ করে উপর্যুপরি তার ওপর হামলা করে। মারধর ও ধারালো দেশীয় অস্ত্রের কোপে তিনি আহত হন। পরে তাকে ধামরাই ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

এদিকে এ ঘটনার পর ভাড়া করা প্রাইভেটকারটি আটক করে ধামরাই থানার কাওয়ালীপাড়া বাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে নেওয়া হয়। পুলিশের দাবি, গাড়ি থেকে ৩০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী মাহফুজুর রহমান ইমন বলেন, ‘আমি ধামরাই উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করতে ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলাম। গাড়ি নিয়ে বালিয়া স্ট্যান্ডে পৌঁছালে হঠাৎ ১০টি মোটরসাইকেল এসে আমার প্রাইভেট কার ঘেরাও করে। তারা বলে, ‘‘চেয়ারম্যানের ডাকে’’। আমি বলি, আমার তাড়া আছে। কিন্তু তারা জবরদস্তি করছিল। আমি চিন্তা করলাম, গাড়ির কোনও ক্ষয়ক্ষতি হলে ঝামেলা হবে। তারা চাপ সৃষ্টি করছিল। পরে তারা আমাকে নিয়ে গেছে। পরে সেখানে আমি জানতে চাই, কী সমস্যা, কী কারণে এমন করা হচ্ছে। তখন তারা বলে, ‘‘তুই আমাকে প্রাইভেট কার দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিস, পরিকল্পিতভাবে।’’ এরপরই নিজের অনুসারীদের মোকসেদ বলেন, ‘‘কই, এখনও মারস নাই?’’ এ সময় আমি গাড়ির দরজা খুলতেই অতর্কিতভাবে ২৫ থেকে ৩০ জন আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। চেয়ারম্যান নিজে ও তার ছেলেও আমাকে গাড়ি থেকে টেনে বের করে জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলে। আমার ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। শরীরে কাটা-ছেঁড়ার চিহ্নও স্পষ্ট রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি ও মোকসেদ একই এলাকার। আমি আগামী নির্বাচনে জুয়েল আহমেদ বাদলকে সমর্থন করছি। তিনি কিছু দিন ধরেই এই বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে বিরোধ করছিলেন। তিনি এমনও বলেছেন, ‘‘তুই ওর সঙ্গে থাকবি কেন? তুই আমার সঙ্গে থাকবি। তোর যে ক্যারিয়ার, তুই আমার সঙ্গে থাকবি। তুই ওর সঙ্গে কেন যাবি? আর ওর সঙ্গে তোর কী?’’ এরপর তিনি ওই প্রার্থীকে হাজির করতে বলেন। আমার ধারণা, তাকে পেলে হয়তো মারধর করা হতো। আমি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। নেতাদের জানিয়েছি। আমি মামলা করবো।’

গাড়ি থেকে গাঁজা উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি একটা জানাজায় যোগ দিতে যাচ্ছিলাম। আমার এলাকায় খোঁজ নেন। আমার বিষয়ে এমন কিছু পাওয়া যায় কি না। আমি নিজে মাদকবিরোধী প্রতিবাদ করি। তারা আমার গাড়ি উল্টো ভাঙচুর করেছে। গাড়ি তল্লাশি করেও কিছু পাওয়া যায়নি। পরে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও আমার চালককে সেখানে রেখে দেওয়া হয়। এরপর তার সঙ্গে কী করা হয়েছে, তা আমি জানি না। তারা নিজেরাই রেখে কিছু দাবি করতে পারে। কারণ, মোকসেদ এলাকায় ফিরে গত কিছু দিন ধরেই কয়েকজনকে মাদকসহ আটক করেছেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা হয়নি। আর মাদক ধ্বংসও করা হয়নি। জমিয়ে রাখা সেই মাদক দিয়েই আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করতে পারে।’

যদিও ভিন্ন বিবরণ চৌহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পারভীন হাসান প্রীতির কাছে। যিনি রফিকুল ইসলাম মোকসেদের সহধর্মিণীও। তিনি বলেন, ‘গাড়ির মধ্যে মাদক নিয়ে পালানোর সময় তাকে স্থানীয়রা ধাওয়া দেয়। এ সময় সাবেক চেয়ারম্যান রাস্তার পাশে ছিলেন, তখন তাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় কোনও মারধরের ঘটনা ঘটেনি। আর ওই যুবক পালিয়ে যায়। তবে চালককে আটক করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে।’

তবে এসব বিষয়ে মন্তব্য জানতে রফিকুল ইসলাম মোকসেদকে একাধিকবার মোবাইল ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এসব বিষয়ে ধামরাই থানার কাওয়ালিপাড়া বাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ (আইসি) ইলিয়াস বলেন, ‘চৌহাটে গাড়ি ক্রসিংয়ের সময় ঝামেলা হয়েছিল। পরে যে পাশ দিয়ে সমস্যা হয়েছিল, যে পাশে সাইড দেয়নি, তাকে আবার ওরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। পরে আমাদের ডাকা হয়। স্যারকে জানানো হয়। এরপর আমার টিমের সবাইকে নিয়ে আমি সেখানে যাই। পরে তারা আমাকে বিস্তারিত জানায়। তবে ঘটনাস্থলটি ঠিক কতটুকু জায়গাজুড়ে, তা বুঝতে পারিনি। গাড়িকে সাইড দেওয়া নিয়ে সমস্যা হয়েছিল বলে জানতে পেরেছি। পরে স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে আমরা সেখানে যাই। বিষয়টি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানাই। সেখানে যাওয়ার পর গাড়িতে ৩০ থেকে ৩৫ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’