দীর্ঘ ১৪ বছরের নির্মাণকাজ, যানজটের ভোগান্তি, ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয়ের পর অবশেষে বাতিল হলো ঢাকা-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত এই নির্মিত বিশেষ বাস লেন ও স্টেশন অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সেইসঙ্গে ‘গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’ নামের এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি জটিলতা নিরসনের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এবং পরবর্তী সময়ে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে জমা দিতে বলা হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত রবিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে গাজীপুরের বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জারি করা এক পত্রে সভার আলোচনা ও সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে সড়কটিকে তিন থেকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ককে চার লেনে রূপান্তর করার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত জটিলতা নিরসন এবং প্রকল্প বন্ধের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নিতে বলা হয়েছে। বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) আওতায় নেওয়ার প্রস্তাবও গ্রহণ করেছে মন্ত্রিসভা।
সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, সমন্বয়হীনতা ও নকশাগত জটিলতার কারণে বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে এই সড়কে চলাচলকারী মানুষকে। নির্মাণকাজ চলাকালে ক্রেন দুর্ঘটনা ও লঞ্চিং গার্ডার ধসে নিরাপত্তারক্ষী জিয়াউর রহমানসহ অন্তত সাত জন পথচারী ও শ্রমিকের প্রাণহানিও ঘটেছে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মন্ত্রিসভায় চারটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়—১. প্রকল্পটি বাতিল করে দেওয়া। ২. অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে বিআরটি বাস কিনে চলাচলের ব্যবস্থা করা। ৩. বিআরটি পথটি যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে বিশেষ বাস ও বিদ্যমান বেসরকারি বাস চলতে দেওয়া। ৪. বিআরটি পথটিকে টোলের আওতায় এনে পরিচালনা করা। শেষে সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বিদ্যমান স্টেশন, বিআরটি লেন আলাদা করার জন্য নির্মাণ করা বিভাজক ভেঙে ফেলতে হবে। উড়ালপথ ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করা হবে।
উত্তরবঙ্গের ২৩টি জেলা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের সাতটি জেলাসহ মোট ৩০ জেলার মানুষের রাজধানীতে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ গাজীপুর। ১৪ বছর আগে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার মহাসড়ক ছিল সরু ও অপরিকল্পিত। ফুটওভারব্রিজের অভাব, কাঁচাবাজার, বাসের স্টপেজ, আবর্জনার স্তূপ এবং অবৈধ যানবাহনের দাপটে এ সড়কে প্রতিদিনই লেগে থাকতো তীব্র যানজট।
বিআরটি প্রকল্পের কাজ শুরুর পর থেকেই সামনে আসে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের নানা দুর্বলতা। পর্যাপ্ত সমীক্ষা ও পূর্ণাঙ্গ নকশা ছাড়াই কাজ শুরু করায় সড়কের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তর এবং নির্মাণকালে বিকল্প যান চলাচলের ব্যবস্থা যথাযথভাবে করা হয়নি। ব্যস্ত এই মহাসড়কে স্ট্রিট লাইট ও ফুটপাতেরও ঘাটতি ছিল।
ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন ও বিভিন্ন সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পের কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। ২০১২ সালে অনুমোদন পেলেও বড় পরিসরে মাঠপর্যায়ের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে সড়কের মাঝখানে সিমেন্টের প্রতিবন্ধক ও লোহার বেড়া থাকায় চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। ধুলাবালি ও যানজটে ভোগান্তিতে পড়েন বিমানবন্দর-গাজীপুর পথে চলাচলকারী লাখ লাখ মানুষ, বিশেষ করে পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা।
২ হাজার কোটি থেকে প্রকল্প ব্যয় ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি
দ্রুত যাতায়াতের ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে ২০১২ সালের নভেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বিআরটি প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন পায়। প্রাথমিক পরিকল্পনায় গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিআরটি লেন নির্মাণের কথা ছিল। পরে সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কেরানীগঞ্জের অংশ বাদ দিয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রকল্পটি সীমিত করা হয়।
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ি পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের মধ্যে ১৫ দশমিক ০৭ কিলোমিটার সড়কপথ এবং বাকি অংশ উড়ালপথ। সড়কের মাঝখানে পৃথক লেন তৈরি করে বিশেষ বাস চালানোর পরিকল্পনা ছিল।
প্রকল্পটি চালুর সময় বলা হয়েছিল, বিআরটি চালু হলে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে মাত্র ৩০ মিনিটে বিমানবন্দরে পৌঁছানো যাবে। প্রতি ঘণ্টায় ২০ হাজার যাত্রী পরিবহনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছিল। অন্য এক হিসাবে, প্রকল্প চালু হলে দিনে প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, পৃথক লেনে চলায় বিআরটি বাস সাধারণ যানবাহনের যানজট ও সিগন্যালের বাধা এড়িয়ে চলতে পারবে।
২০১২ সালে প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) ও গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ) প্রকল্পে অর্থায়ন করে। বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ), সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় তিনটি চীনা প্রতিষ্ঠান। বিআরটি পরিচালনার জন্য ২০১৩ সালে গঠন করা হয় ‘ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি’।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করে করা হয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা প্রাথমিক ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। পরে ২০২৫ সালে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো এবং ব্যয় ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে ওই বছরের ২৭ জুলাই একনেক সভায় বর্ধিত ব্যয়ের প্রস্তাব বাতিল করা হয়।
এখনও ভোগান্তি
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তবে কোনও স্টেশনের কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত কয়েকটি পদচারী-সেতুতে চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট রয়েছে। কিন্তু এসব স্থাপনার অনেকগুলোই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে। বিআরটি লেন আলাদা করতে সড়কের মাঝখানে সিমেন্টের প্রতিবন্ধক বসানো হয়েছে। কিছু স্থানে লোহার বেড়া দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে সড়কের জায়গা কমেছে। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল সড়ক, আবার কোথাও সরু লেন থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। প্রকল্প বাতিল করার ফলে স্টেশনগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। লিফটসহ অন্যান্য যন্ত্র অন্য কোনও স্থানে ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে সওজের।
তৈরি হয়েছে স্টেশন, ব্যবহার হচ্ছে না অবকাঠামো
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। তবে কোনও স্টেশনের কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত কয়েকটি পদচারী সেতুতে চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট রয়েছে। কিন্তু এসব স্থাপনা এখন আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে। প্রকল্পটি বাতিল করে অবকাঠামো অপসারণের সিদ্ধান্তে ইতিমধ্যে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন গাজীপুরের রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা।
বিআরটি উন্নত ব্যবস্থাপনায় চালু করা উচিত
গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রকল্পটি বাতিল করে নতুন করে আরেকটি প্রকল্প নেওয়া সরকারের অদূরদর্শিতার পরিচয়। এতে অনেক টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। তাই প্রকল্পটিকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, তা ভাবা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘একটি প্রকল্পকে বাস্তবায়ন না করে আবার আরেকটা করা কল্যাণকর হবে না। বিআরটিকে উন্নত ব্যবস্থাপনায় এবং রাস্তাঘাটকে সুন্দর করে চালু করার মাধ্যমে ভালো হবে।’ তার ভাষ্যমতে, প্রকল্পটি সংস্কার করে উন্নত ব্যবস্থাপনায় চালু করা গেলে বিপুল অর্থের অপচয় এড়ানো সম্ভব হবে।
গাজীপুর জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির বলেন, ‘জনগণের রাজস্ব অপচয়ের পর শেষ মুহূর্তে বিআরটি প্রকল্প বন্ধ করে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত হতাশাজনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। অপরিকল্পিত পরিকল্পনা, লাগামহীন দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাবের মাশুল শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘শুধু প্রকল্প ভেঙে ফেললেই দায় শেষ হবে না। এর ব্যর্থতার পেছনে থাকা অদক্ষতা ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’
অপরদিকে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার সরকারের সিদ্ধান্তকে বাস্তবসম্মত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই বিআরটি প্রকল্প ফ্যাসিস্ট সরকারের লুটপাটের একটি খাত ছিল, যা সাধারণ মানুষের গলার কাঁটা হয়ে রয়েছে।’
শওকত হোসেন সরকারের ভাষ্য, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর অংশে চলাচলকারী মানুষ প্রায় ১৪ বছর ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে এই পথে চলাচলকারী বাস ও যাত্রীরা স্বস্তি পাবেন।
এখনও লিখিত নির্দেশনা পায়নি সড়ক বিভাগ
গাজীপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তারা এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও লিখিত চিঠি পাননি। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার খবর দেখেছেন। আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়ার পর কী করতে হবে, তা বুঝতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হবে, আমরা সেভাবেই কার্যক্রম করবো।’