সুন্দরবনে গত এক মাসে নাশকতাকারী হিসেবে আটজনকে শনাক্ত করে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে বন বিভাগ। বাগেরহাট পুলিশ সুপার নিজাম উল হক মোল্লা বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এছাড়া বছরের চারটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার তদন্তে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি তদন্ত কমিটিসহ দুটি কমিটি গঠিত হয়েছে।
দায়েরকৃত মামলার প্রথমটি বাগেরহাট জেলা আদালতে ও দ্বিতীয়টি শরণখোলা থানায় দায়ের করা হয়। আদালতে দায়ের করার মামলাটির ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তৈরি ওয়ারেন্ট বুধবার শরণখোলা থানায় এসে পৌঁছে। শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহআলম বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেন।
দুটি মামলারই প্রধান আসামি শরণখোলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহজাহান হাওলাদার ওরফে শাহজাহান শিকারী। বাকিরা হলেন আল আমিন হওলাদার, ইউনুস হাওলাদার, শাহেদ আলী হাওলাদার, খলিল হাওলাদার, সগীর হাওলাদার, ইলিয়াস হাওলাদার ও মাসুম হাওলাদার। এখনও কাউকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ।
প্রথমে ২৭ মার্চ সুন্দরবনে বছরের প্রথম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অজ্ঞাতদের নামে একটি মামলা দায়ের করে বনবিভাগ। ১৩ এপ্রিল অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তিতে টনক নড়ে সংশ্লিষ্ট এই বিভাগের। ওই ঘটনার পর ছয়জনের (শাহজাহান হাওলাদার, আল আমিন হওলাদার, ইউনুস হাওলাদার, শাহেদ আলী হাওলাদার, খলিল হাওলাদার, সগীর হাওলাদার) নামে দায়ের করা মামলায় পরিকল্পিত নাশকতার অভিযোগ করে বন বিভাগ, যা গত চৌদ্দ বছরের মধ্যে প্রথম। ১৮ এপ্রিল অগ্নিকাণ্ডের পর নাশকতার অভিযোগ এনে প্রথম মামলার প্রথমোক্ত তিন ব্যক্তিসহ মোট পাঁচজনের (শাহজাহান হাওলাদার, আল আমিন হওলাদার, ইউনুস হাওলাদার, ইলিয়াস হাওলাদার, মাসুম হাওলাদার) নামে মামলা করা হয়।
এদিকে বুধবার (২৭ এপ্রিল) সুন্দরবনে নুতন করে আগুন লাগার ঘটনাকে নাশকতা হিসেবে উল্লেখ করে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে শরনখোলা থানায় সাধারণ ডায়রি (জিডি) হয়েছে। পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশন কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ এ অভিযোগ করেন।
অভিযুক্ত আট জনের সবাই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা বিভিন্ন সময় বন বিভাগের কর্মকর্তাকে জিম্মি করে বনে নাশকতা চালিয়ে আসছে।
জানা যায়, গত ১৪ বছরে সুন্দরবনে ২৫ বার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এবারই প্রথমবারের মত আটজনকে শনাক্ত করেছে বন বিভাগ। সেইসঙ্গে নাশকতা সৃষ্টিকারীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতার অভিযোগে বন বিভাগের তিন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের নাংলী টহল ফাঁড়ির ইনচার্জ নাসির উদ্দিন হাওলাদার, বোটম্যান (নৌকা চালক) মোবারক হোসেন ও পলাশ মজুমদার।
এর আগে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বন বিভাগের কার্যক্রম কেবল সাধারণ ডায়রি করা ও তদন্ত কমিটি গঠন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের ডিএফও মো. সাইদুল ইসলাম জানান, বনের প্রায় একই এলাকায় বারবার আগুন লাগার ঘটনা ঠেকাতে চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায় প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করেছে বন বিভাগ। অতিরিক্ত সর্তকতা হিসেবে পূর্ব সুন্দরবনের এই এলাকায় বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের পাস পারমিট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের চাদপাই রেঞ্জের ধানসাগর ষ্টেশন এলাকার তুলাতলা ও আন্ধরমানিক নামক স্থানে বুধবার বিকালে নতুন করে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে বনকর্মী ও ফায়ার সাভিসের কর্মীরা। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর আগুনের তীব্রতা কমলেও বিচ্ছিন্নভাবে বনের বেশ কিছু এলাকায় ধোয়া ও আগুন রয়েছে। মোরেলগজ্ঞ, শরনখোলা ও বাগেরহাট ফায়ার সার্ভিসের ৩টি ইউনিট পানি ছিটানোর মাধ্যমে আগুন সম্পুর্ণ নিয়ন্ত্রণে একযোগে কাজ করছে।
গত দুই দিনের আগুনে তুলাতলা ও আন্ধরমানিকে প্রায় ১০ একর বনভূমি পুড়ে গেছে বলে আগুন নেভানোয় সহয়তাকারী স্থানীয় জনগণ দাবি করছেন। তবে বনবিভাগের দাবি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা প্রায় চার একর।
আরও পড়ুন:
তদন্ত কমিটি গঠন
বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) জহির উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, সুন্দরবনে বারবার আগুন লাগার ঘটনায় বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পেয়েছেন বলে জানা সিএফ। চিঠিতে তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (আইন) মো. মোজাহেদ হোসেনের নাম রয়েছে। কমিটিতে বন বিভাগ, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ছাড়াও বাগেরহাট জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের প্রতিনিধিদের সদস্য রাখা হয়েছে।
বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটিকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে সুন্দরবনের আগুন লাগার কারণ উদঘাটন ও ক্ষতি নির্ণয়সহ প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বন সংরক্ষক জানান, খুব শিগগির এ কমিটির সদস্যরা সুন্দরবনের দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করাসহ তদন্ত কার্যক্রম চালাবেন।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের ডিএফও মো. সাইদুল ইসলাম জানান, ২৭ এপ্রিল বিকালে সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের কারণ উদঘাটনে চাঁদপাই রেঞ্জ সহকারী বন সংরক্ষক বেলায়েত হোসেনকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটির সদস্যরা তদন্ত কাজ শুরু করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য
এক মাসের মধ্যে চারবার অগ্নিকাণ্ডে পুড়েছে বনের সুন্দরী, শিংরা, নলবোনসহ বিশাল এলাকা। বনবিভাগ ও স্থানীয়দের দাবি, আগুনের ঘটনাগুলো পরিকল্পিত। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল রাজনৈতিক আশ্রয়ে সুন্দরবনে একের পর এক আগুন লাগিয়ে নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, আগুনে পুড়ে সাফ হওয়া এলাকা লোকালয় থেকে ৪ থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে। বর্ষা মৌসুমে ওই সব এলাকায় পানিতে পূর্ণ হয়ে থাকে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের মাছ ধরার সুবিধার্থেই এই মৌসুমে আগুন ধরিয়ে বন থেকে বড় থেকে ছোট গাছ পালা পুড়িয়ে পরিষ্কার করা হয়। বর্ষায় ওই এলাকায় বিস্তীর্ণ জলাশয় তৈরি হয়। মাছ শিকারের সঙ্গে যুক্তরা এর সুবিধা নিতে এ এলাকার বনে প্রায় প্রতি বছরই আগুন লাগানোর চক্রান্তে যুক্ত থাকে।
বন বিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয়রা জানান, অগ্নিকাণ্ডে সংঘবদ্ধ চক্র খুবই শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলা কঠিন। প্রতিবার আগুন লাগার পরই ওই মহলের নিয়োগকৃতরা স্থানীয় সাধারণ লোকদের গণমাধ্যমে কথা না বলার হুমকি দেয়।
/এইচকে/