সমবায়ী নারীদের সঞ্চয়ে গড়ে উঠেছে যে অ্যালুমিনিয়াম কারখানা

Nabarupa Aluminium Factory (2)সমবায়ীদের নারীদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়। তাই দিয়ে তারা গড়ে তুলেছেন এক অবিশ্বাস্য গল্প। নবরূপা সমবায় সমিতি’র এই নারীরা খুলনায় গড়ে তুলেছেন ‘নবরূপা অ্যালুমনিয়াম কারখানা’ নামে একটি মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান। আট বছর বয়সী এই সমবায় সমিতির গড়া অ্যালুমিনিয়াম কারখানাটি এখন খুলনার অন্যতম লাভজনক শিল্প কারখানা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

এই সমবায় সমিতির সভাপতি নাজমা আক্তার। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি জানান, অসহায় নারী ছাড়া অন্য কাউকে এই সমিতির সদস্য করা হয় না। ২০০৮ সাল থেকে সমবায় শুরু করা হলেও ২০১২ সাল থেকে এর ধারাবাহিক উত্তরণ শুরু হয়। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে এক হাজার একশ বারো জন অসহায় নারী সদস্যের পুঁজি রয়েছে। তাদের গড়া কারখানায় সমবায়ী ৩ নারীসহ প্রায় ৩৩ জন কাজ করেন। মজুরি  ও খরচ বাদে প্রতি মাসে কারখানটি থেকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় হয়।

তিনি আরও জানান, তারা এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে খুবই আশাবাদী। এরইমধ্যে সমিতির আয় দিয়ে পাঁচ শতক জমিসহ প্রায় সোয়া কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন তারা। সামনে ওই জমিতে সমিতির নিজস্ব কার্যালয় এবং নবরূপা কারখানার জন্য বহুতল ভবন করার ইচ্ছা রয়েছে তাদের।

সরেজমিন দেখা গেছে, খুলনা মহানগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার বস্তিবাসীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে সংগঠনটি। এই সমবায় থেকে ঋণ নিয়ে সমিতির এক সদস্য হালিমা বেগম অ্যালুমিনিয়াম কারখানা করেন। তার সাফল্য দেখে সমিতির উদ্যোগে নবরূপা অ্যালুমিনিয়াম কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। খুলনায় বর্তমানে ১৪টি অ্যালুমনিয়াম কারখানা আছে। পুঁজি সংকটের কারণে সেগুলোর বেশিরভাগেরই অবস্থা খারাপ। এর মধ্যেও ভালোভাবেই টিকে আছে অসহায় নারীদের সঞ্চয়ে গড়া নবরূপা অ্যালুমিনিয়াম কারখানাটি।Nabarupa Aluminium Factory working Jobeda & Jorina    

এ কারখানা গড়ার শুরুর দিকে সহযোগিতা দিয়েছিল ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সুন্দরবন এডিপি। কথা হয় সংস্থাটির ব্যবস্থাপক তপন কুমার মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি বলেন, নবরূপা সমবায় অ্যালুমনিয়াম কারখানা করার সময় তাদের প্রায় ৮ লাখ টাকার মালামাল অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। সমবায় থেকে তারা আরও ৪ লাখ টাকা মিলিয়ে কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করে। ওই সমবায়ের নারী সদস্যরা এখন কারখানাটি পরিচালনা করছেন।
অ্যালুমনিয়াম কারখানাটির শ্রমিক মালেকা বেগম বলেন, এ শিল্পের কাজে বেশ কষ্ট। প্রচুর শ্রমও দিতে হয়। কাঁচামাল থেকে শুরু করে পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সর্তক থাকতে হয়। একটু ভুল হলে পণ্যের মান খারাপ হয়। তবে এখানে ভালো কাজ করতে পারলে মজুরিও ভালো।

নবরূপা সমবায়ের গড়া অ্যালুমিনিয়াম কারখানার মিস্ত্রি আরিফ হোসেন বলেন, তিনিসহ চারজন এই সমবায় সমিতির সদস্যদের সন্তান। তারা উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে প্রতি সপ্তাহে চৌদ্দশ’ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পান।
Nabarupa Aluminium Factory

নবরূপা সমবায়ের সদস্য জোহরা খাতুন বলেন, একজন সদস্যের ভাড়া বাসার বারান্দা থেকে তারা সমবায় সমিতির কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। এখন তাদের নিজস্ব জমিসহ আয় বৃদ্ধিমূলক চারটি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে অ্যালুমনিয়াম কারখানাটি বেশি লাভজনক। নিজস্ব জমিতে আগামীতে ৬ তলা ভবন করাসহ মাল্টি পারপাস ব্যবসার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভবন করার জন্য এ পর্যন্ত তের লাখ টাকার ফান্ড জমাতে পেরেছেন তারা। তবে এজন্য যেতে হবে আরও বহুদূর।

এদিকে, সম্ভাবনাময় অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের প্রসার ঘটাতে আরও পৃষ্ঠপোষকতা দরকার বলে মনে করেন খুলনার নবরূপাসহ অন্য কারখানাগুলোর মালিকরা। এজন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন তারা।

খুলনার গল্লামারী এলাকার আলাউদ্দিন মেটালের মালিক মোশারেফ খান জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে অ্যালুমনিয়ামের ব্যবসা করছেন তিনি। কিন্তু মেশিনারিজসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী জন্য পুঁজি জোগাড় করা কষ্টসাধ্য। ঠিকমতো ব্যাংক ঋণ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও প্রয়োজনীয় জমি না পাওয়া গেলে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ শিল্পের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

গল্লামারী এলাকার মায়ের দোয়া স্টোর নামে অপর একটি অ্যালুমনিয়াম কারখানার মালিক মো. আসিফ বলেন, ‘ঠিক মতো বিনিয়োগ করা গেলে এ শিল্পে নতুন ধারা সৃষ্টি করা সম্ভব।’

/জেবি/টিএন/আপ-এআর/